চন্দ্রসেন তঞ্চঙ্গ্যা
বাংলাদেশে বসবাসকারী অন্যতম সংখ্যাগরিষ্ঠ নৃগোষ্ঠী ‘তঞ্চঙ্গ্যা’। তাঁদের প্রধান আবাস চট্টগ্রাম বিভাগের চারটি জেলায়- রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার। বাংলাদেশ ছাড়াও পাশর্^বর্তী ভারত ও মায়ানমারে তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর সুদীর্ঘকাল ধরে বসবাস রয়েছে। তাঁদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান রয়েছে। তাঁরা বৌদ্ধধর্ম পালন করেন। সুপ্রাচীনকাল থেকে বৌদ্ধধর্মের পাশাপাশি তাঁদের সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে সনাতন বা হিন্দুধর্মের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। প্রকৃতির পূজা বা পৌত্তলিক প্রথাও তাঁদের সমাজে প্রচলন রয়েছে। বৌদ্ধধর্ম, হিন্দুধর্ম ও প্রকৃতি পূজার মতো মিশ্রিত এক ধর্মীয় আবহ তাঁদের সমাজে বিরাজমান। এ প্রবন্ধে সেসব আচার-প্রথাসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা করা হবে।
প্রব্রজ্জ্যা সংক্রান্ত
বৌদ্ধ হিসেবে প্রত্যেক তঞ্চঙ্গ্যা পুরুষকে জীবনে একবার হলেও প্রব্রজ্জিত হওয়ার প্রথা প্রচলিত রয়েছে। তাঁদের বিশ^াস উপযুক্ত বয়সে জীবনের যেকোনো সময়ে অন্তত সাত দিনের জন্য হলেও প্রব্রজ্জিত হতে হয়। সাত দিন ব্যাপী প্রব্রজ্জিত জীবনে উত্তমরূপে দশশীল পালন করতে পারলে অধিক পুণ্য সঞ্চয় হয় বলে তাঁদের বিশ^াস।
তাঁদের মতে, সংসারাবদ্ধ হওয়ার পূর্বে প্রব্রজ্জিত হওয়া উত্তম। বিয়ের পর প্রব্রজ্জিত হলে উক্ত পুরুষটি সংসার জীবনে আর ফিরবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। এতে তাঁর বিবাহিত স্ত্রী ও সন্তানাদি দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। যদি পুরুষটি দীর্ঘ সময় ধরে প্রব্রজ্জিত জীবন পরিত্যাগ না করে, তাহলে তাঁর বিবাহিত স্ত্রী তাঁকে অপেক্ষা করতে পারে। নতুবা ইচ্ছে করলে অন্যত্র বিবাহ করার অধিকারও তাঁর থাকে। এ ধরনের ঘটনা খুব কমই দেখা যায়। তবে উদাহরণ হিসেবে রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবিরের সংসার জীবনকে উল্লেখ করা যায়।
[রুদ্রসিং কার্বারি ও ইচ্ছাবতী তঞ্চঙ্গ্যার কণিষ্ঠ সন্তান ফুলনাথ তঞ্চঙ্গ্যা। কৈশোরে পিতা-মাতার আগ্রহে তাঁকে বিয়ে দেয়া হয়। তাঁর সংসারে একপুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। অতপর পরিবারের অনুমতি নিয়ে তিনি প্রব্রজ্জ্যা গ্রহণ করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২২ বছর। কিন্তু তিনি আর সংসার জীবনে ফিরে যাননি (পরে তিনি রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবির নামে পরিচিতি লাভ করেন)। ফুলনাথ সংসারে ফিরে আসার সম্ভাবনা না দেখে তাঁর স্ত্রী পুনরায় অন্যত্র বিবাহ করেছিলেন। এতে ফুলনাথের পরিবার ও সমাজ তাঁকে বাঁধা দিতে পারেনি।]
সংসারে আবদ্ধ কোনো পুরুষ প্রব্রজ্জিত হলে তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্ক আংশিক ছিন্ন হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। ফলে পুনরায় সংসার জীবনে ফিরে এলে তাঁকে নতুন করে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হতে হয়। সমাজস্থ মুরুব্বি ও আত্মীয়-স্বজনকে ডেকে এই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। আগত অতিথিদের জন্য ভুড়িভোজের ব্যবস্থা করতে হয়। এই অনুষ্ঠানটিকে ‘চাম্বানি খানা’ নামে অভিহিত করা হয়। এই ‘চাম্বানি খানা’ ব্যতীত স্ত্রীর সহবাসে গেলে সামাজিকভাবে সে দোষী সাব্যস্থ হয় এবং সামাজিক প্রথা অনুসারে ‘ছিনালি শুকর’ জরিমানা দিয়ে সামাজিক বিধি-ব্যবস্থা সম্পাদন করে পুনরায় সংসার জীবনে প্রবেশ করার নিয়ম রয়েছে।
এছাড়াও পিতা বা মাতার মৃত্যুর পরে ‘সাত-দিন্যা’ বা সাপ্তাহিক ক্রিয়ার সময়ে তাঁর বংশীয় পুত্র বা ভ্রাতুষ্পুত্র বা নাতি বা নিকট আত্মীয়কে সাত দিন বা ততোধিক সময়ের জন্য প্রব্রজ্জিত করানোর নিয়ম প্রচলিত রয়েছে।
বিহার দান
সাধারণত একটি সমাজ বা গ্রাম বা কয়েকটি গ্রাম মিলে তঞ্চঙ্গ্যাগণ বিহার নির্মাণ করে থাকেন। ভিক্ষুসংঘের উদ্দেশ্যে বিহার দান একটি উত্তম কর্ম হিসেবে পরিগণিত হয়। এ ধরনের বিহার নির্মাণ দান ছাড়াও তাঁরা বিহারের পাশে দূরদুরান্ত হতে আগত পুণ্যার্থীদের থাকার জন্য আবাসনের ব্যবস্থাও করে থাকেন যা ‘ধর্মঘর’ নামে পরিচিত। উদাহরণ হিসেবে চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার এলাকায় পুণ্যার্থীদের থাকার জন্য নির্মিত আবাসন সমূহ। এছাড়াও মৃতব্যক্তির উদ্দেশ্যে ৫দ্ধ৫ বর্গহাত বিশিষ্ট ছোট একটি মাচাংঘর নির্মাণ করে দান করার রীতি প্রচলিত রয়েছে। এটি ‘চেরাগ ঘর’ নামে পরিচিত। এটি মৃতব্যক্তির কল্যাণের উদ্দেশ্যে আয়োজিত ‘সাতদিন্যা’ নামক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময়ে ভিক্ষুসংঘের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়।
বাড়িতে বুদ্ধবিম্ব বা প্রতিচ্ছবি স্থাপন
প্রতিটি তঞ্চঙ্গ্যা নিজ বাড়িতে একটি বুদ্ধের আসন স্থাপন করেন এবং তাতে বুদ্ধের মূর্তি বা প্রতিচ্ছবি স্থাপন করে পূজা করেন। তাতে সকাল-সন্ধ্যা প্রদীপ পূজা, জল পূজা, পুষ্পপূজা, সুগন্ধীপূজার পাশাপাশি বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিগণও বন্দনা করে থাকেন। সেই বুদ্ধবিম্ব বা প্রতিচ্ছবিকে ভক্তিভরে পিÐদানও করা হয়ে থাকে। বাড়িতে একটি বুদ্ধবিম্ব বা প্রতিচ্ছবি থাকলে ঘরে পবিত্রতা রক্ষিত হয় এবং সকল প্রকার অশুভশক্তি হতে রক্ষা পাওয়া যায় বলে দৃঢ় বিশ^াস রয়েছে।
বুদ্ধবিম্ব বা প্রতিচ্ছবি সাধারণত মূলঘরের বারান্দা বা ‘পিনা’ নামক অন্ত:স্থ কক্ষে আসন পেতে কিংবা বুক সমান উঁচু স্থানে স্থাপন করা হয়। ঘরে বুদ্ধবিম্ব বা প্রতিচ্ছবি থাকার কারণে ঘরের চালের উপর নারীদের উঠা নিষেধ। এতে ঘরের পবিত্রতা নষ্ট হয় বলে বুড়োবুড়িরা বলে থাকেন।
জাদিমেলা
অনেক তঞ্চঙ্গ্যা গ্রামে বৌদ্ধ বিহারের পাশাপাশি জাদি বা বৌদ্ধস্তুপও নির্মাণ করা হয়ে থাকে। এই জাদি বুদ্ধধাতু কিংবা অর্হৎধাতু স্থাপন করে নির্মাণ করা হয়। জাদি হলো বুদ্ধধাতুকে পূজা করার এবং ধর্ম সাধনার এক পবিত্র স্থান।
প্রতিবছর সাধারণত প্রবারণা পূর্ণিমার সময়ে ‘জাদিমেলা’র আয়োজন করা হয়ে থাকে। আবার অর্থশালী ও ধর্মপ্রাণ কোনো কোনো তঞ্চঙ্গ্যা পরিবার বাড়ির পাশে সুবিধাজনক স্থানে বাঁশ-কাঠ দিয়ে একটি অস্থায়ী জাদি নির্মাণ করে জাদিমেলার আয়োজন করে থাকেন এবং সেসময়ে বিভিন্ন দানানুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন। [নিজ গ্রামে এ ধরনের অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হয়েছে] তবে জাদিমেলার নামে সেই পবিত্র স্থানে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নারী-পুরুষের সম্মিলিত উদ্ভট নৃত্য বৌদ্ধনীতি সম্মত নয়। নারী-পুরুষের সম্মিলিত এমন উদ্ভট নৃত্য পরিহার করে ধর্মসম্মত উপায়ে জাদিমেলার আয়োজন করা উচিত।
বূহ্যচক্র মেলা
অতীতে অনেক তঞ্চঙ্গ্যা গ্রামে ‘বূহ্যচক্র’ নামে একটি মেলার আয়োজন করা হতো। এটি তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় ‘বইমেলা’ নামে পরিচিত। এ মেলা খোলা মাঠে আয়োজন করা হয়। বুক সমান উঁচু অনেকগুলো বাঁশের বেড়া সাজিয়ে পথের ধাঁধা তৈরি করা হয়। এতে একটি প্রবেশ পথ ও একটি বহির্গমনের পথ থাকে। এটি বূহ্যচক্র নামে পরিচিত। অনেকে এই বূহ্যচক্রে প্রবেশ করার পর পথ হারিয়ে কেবল ধাঁধার মধ্যে ঘুরতে থাকেন। বিশ্বাস করা হয়, যিনি খুব সহজে সেই ধাঁধা পার হতে পারেন, তিনি ধার্মিক বা পুণ্যবান। আর যিনি সেই ধাঁধায় ঘুরতে থাকেন, তাঁর পুণ্যের ভাগ খুবই কম। তাঁকে আরও পুণ্যার্জন করতে হবে। এই ধরনের ধাঁধায় পাপ ও পুণ্যের পরীক্ষা করে অনেকে আরও বেশি পুণ্যকর্ম সম্পাদন করেন বলে শোনা যায়।
ভিক্ষুসংঘকে কুলপুত্র বা কন্যাদান
অনেক তঞ্চঙ্গ্যা পিতা-মাতা সন্তানের ভবিষ্যতের মঙ্গলের জন্য ভিক্ষুর নিকট পুত্র বা কন্যাকে দান করে থাকেন। তখন উক্ত ভিক্ষু দানকৃত পুত্র বা কন্যাটিকে নতুন নাম প্রদান করেন এবং দানকৃত পুত্র বা কন্যটিকে লালন-পালনের জন্য পুনরায় উক্ত মাতা-পিতার হাতে অর্পন করেন। উক্ত শিশুর ফারাদশা বা বিপদাপদ কাটানোর জন্য ভিক্ষুসংঘকে পুত্র বা কন্যা দানের এই রীতি প্রচলিত রয়েছে। এটি বৌদ্ধরীতি সম্মত কিনা জ্ঞাত নয়।
চুমুলাংপূজা
তঞ্চঙ্গ্যাদের গৃহ দেবতার নাম ‘চুমুলাং’ এবং তার উদ্দেশ্যে ‘চুমুলাংপূজা’ করা হয়। এটি একটি সামষ্টিক পূজা। এখানে একসাথে সাতটি দেব-দেবীর পূজা করা হয়। এ পূজার দ্বারা সনাতন ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ অনেক দেব-দেবী পূজিত হয়ে থাকেন। যেমন- কালী, শিব, গঙ্গা, অগ্নিদেব প্রভৃতি। প্রতিটি পূজায় একজোড়া পরিণত বয়সী দেশী মোরগ ও মুরগী বলি দেয়া হয়ে থাকে। এটি নিঃসন্দেহে বৌদ্ধধর্ম সম্মত প্রথা নয়।
আগের দিনে নতুন বছর প্রবেশ করলে ‘নআ বছর চুমুলাং’ করতে হয়। এ চুমুলাংপূজা না করলে সে বছর আর অন্য কোনো বলিপূজা করা যেতো না। নতুন ঘরে প্রবেশ করলে অবশ্যই ‘নআ ঘর চুমুলাং’ করতে হয়। নবজাতকের জন্ম হলে ‘নআ মাইন্স্য চুমুলাং’ করতে হয়। নয়তো নবজাতককে অশুভ আত্মা বিভিন্ন অসুখ-বিসুখে ভোগায় কিংবা তার কুলে নিতেও পারে বিশ্বাস করা হয়। নব বিবাহিত দম্পতির জন্য ‘নআ বোঅ চুমুলাং’ করতে হয়। নববধু ‘চুমুলাংপূজা’য় প্রণাম না করলে সে নববধু হিসেবে গণ্য হয় না। তখন নববধুর সাথে একই শয্যায় ঘুমালে ‘বর’ সামাজিকভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকে। তখন তাকে সমাজের চাহিদা মোতাবেক জরিমানা দিতে হয়। আবার অনেকে নিজের ও পরিবারের সুখ-শান্তি ও উন্নতির জন্যও চুমুলাংপূজা মানত করে থাকেন যা ‘মাইন্যা চুমুলাং’ নামে পরিচিত।
সুপ্রাচীনকাল থেকে এই পূজা তঞ্চঙ্গ্যাগণ পালন করে এলেও এমন অবৌদ্ধ আচরণ সকলের পরিহার করা উচিত। আশার কথা হলো, আধুনিক শিক্ষিত তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে এই ‘চুমুলাংপূজা’ নাই বললেই চলে। এ পূজার স্থলে বৌদ্ধ বিধি মোতাবেক মঙ্গলসূত্র শ্রবণ, সংঘদান, অষ্টপরিষ্কারদান সহ বিবিধ ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করতে দেখা যায়।
লক্ষী পূজা
দেবী লক্ষী বৌদ্ধধর্মের অংশ নয়। এটি সনাতন ধর্মের দেবী দুর্গা ও শিবের কন্যা। তিনি ঐশ^র্যের দেবী হিসেবে সকলের গভীর ভক্তি-শ্রদ্ধা লাভ করেন। তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে তিনি ‘মা- লক্ষী’ নামে পরিচিত। তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে এই ‘মা- লক্ষী’ কিভাবে প্রবেশ করেছিল, তা বোধগম্য নয়।
নতুন ঘর তোলার সময় ঘরের মূলখুঁটিটি এই মা- লক্ষীর জন্য পোঁতা হয়। সেই খুঁটির গোড়ায় জল, সোনা ও রূপাসহ বাঁশের চোঙা পোঁতা হয়। খুঁটিতে তীর-ধনুক, আমপাতা, জামপাতা বাঁধা হয়। ঘর বাঁধা শেষ হলে মূলখুঁটির সাথে মা- লক্ষী র জন্য আসন বাঁধা হয় এবং মা- লক্ষীর ছবি বসিয়ে সকাল-সন্ধ্যা পূজা করা হয়। পরিবারে ভালো কোনো সাফল্য বা উন্নতি হলে বুধবারের সন্ধ্যায় বেশ ঘটা করে মা- লক্ষীর পূজা করা হয়।
বুধবারকে ‘লক্ষীর বার’ বলা হয়। এই দিনে ধার দেওয়া নিষেধ। এই দিনে ধার দিলে মা-লক্ষী বেজার হয় বলে বিশ্বাস করা হয় যা পরিবারের উন্নতিতে অন্তরায় হয়ে থাকে। এছাড়াও বুধবারে কোন কন্যার বিয়ে হলে সাথে করে ঘরের সকল ভাগ্য নিয়ে যায় বলে বিশ্বাস করা হয়। সুতরাং পারতপক্ষে বুধবারে কন্যার বিয়ে দেয়া হয় না।
ঘরের মূলখুঁটি যে কক্ষে পড়ে সেটি ‘মূলগুধি’ নামে পরিচিত। সেই ঘরে যে কেউ বাস করতে পারে না। ঘরের প্রধান দম্পতি কিংবা তাঁরা বয়োবৃদ্ধ হলে পরিবারের ভরণ-পোষণকারী পুত্র ও পুত্রবধু এই কক্ষে বাস করার অধিকারী হন। মূলখুঁটির গোড়ায় চাউলের পাত্র রাখার রীতি প্রচলিত রয়েছে। সেই চাউলের পাত্র হতে চাউল নিয়ে প্রতিদিন রান্নাবান্না করা হয়। এছাড়াও জুমচাষ বা ধানচাষ করলে প্রতি মৌসুমে এক গোছা পাকা ধানের শীষ এই মূলখুঁটিতে বেঁধে দেয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে। এটিও বৌদ্ধধর্ম সম্মত নয় বিধায় পরিহার করা উচিত। নতুন ঘর তোলার ক্ষেত্রে বরং ভিক্ষুসংঘকে আমন্ত্রণ করে মঙ্গলসূত্র শ্রবণের দ্বারা সেই ভিটাতে পবিত্রজলে সিক্ত করা উচিত বলে মনে করি।
কোমর-বন্ধনী বাঁধা
শিশুর জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সুতা দিয়ে তৈরি একটি কোমর-বন্ধনী প্রতিটি তঞ্চঙ্গ্যা নারী-পুরুষ বেঁধে থাকেন। কচি শিশুর ক্ষেত্রে কালো সুতা দিয়ে এ কোমর বন্ধনী তৈরি করতে হয়। বড়োদের ক্ষেত্রে সুতার রং নিয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
এই কোমর বন্ধনী না পরলে পেটের আতুরি ছিঁড়ে যায় বলে প্রবীনেরা ধমক দিতেন। অনেক অনুসন্ধানের পর জানা গেল এটি সনাতনী প্রথার একটি অংশ। সনাতন ধর্মের দেবী কালি বা শ্যামাদেবীর গলায় ঝুলানো মুÐমালার হার কিংবা ব্রাহ্মণদের গলায় ঝুলানোর পৈতা লুকিয়ে পরার জন্য তঞ্চঙ্গ্যাগণ (গলায় পরলে শোভনীয় নয় বলে) তা কোমরে পরে থাকেন। এটি সনাতন ধর্মের প্রতি তাঁদের গভীর ভক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তবে আধুনিক শিক্ষিত সমাজ এই কোমর বন্ধনী পরিহার করে যাচ্ছেন এবং প্রয়োজন না থাকলে পরিহার করা উচিত।
বোরপারা
সকল বিপদাপদ হতে মুক্তি, অশূচি হতে মুক্তির জন্য তঞ্চঙ্গ্যাগণ সপরিবারে জলে নেমে মাথার চুল ধোয়ার একটি পূজানুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন। এটি ‘বোরপারা’ নামে পরিচিত। এজন্য পূজার বিধি অনুসারে মোরগ-মুরগী, ছাগল কিংবা শুকর বলি দেয়া হয়। এটি অনেকটা গঙ্গা¯œান করে নিজের সকল অপরাধ জলে ভাসিয়ে দিয়ে নিজেকে পবিত্র করার মতো।
পরিবারের সদস্যগণ ঘনঘন অসুখ-বিসুখে পড়লে, ঘনঘন ঘোরতর বিপদে পড়লে, পরিবারের কারো মৃত্যু হলে সুবিধাজনক সময়ে এই ‘বোরপারা’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরিবারকে শুদ্ধ বা পবিত্র করার রীতি তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে প্রচলিত রয়েছে। চুমুলাংপূজার মতো এটিও বৌদ্ধধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়। আধুনিক সময়ে মঙ্গলসূত্র শ্রবণ, সংঘদান, অষ্টপরিষ্কার দান সম্পাদনের মাধ্যমে পরিবারের পবিত্রতা ফেরানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকে।
জলদান
জলের অপর নাম জীবন। অনেক তঞ্চঙ্গ্যা গ্রামের ছায়াযুক্ত স্থানে ছোট মাচাংঘর বেঁধে তাতে জলের কলস রাখা হয়ে থাকে। দূর-দুরান্ত থেকে আগত পিপাসার্ত পথিক উক্ত জলের পাত্র হতে জল পান করে তৃষ্ণা নিবারণ করে থাকেন। পিপাসার্ত ব্যক্তিকে জল দান করা ধর্মসম্মত কর্ম। প্রত্যেক তঞ্চঙ্গ্যা গ্রামে একাধিক স্থানে জলপাত্র স্থাপন করে এমন রীতি ধরে রাখা উচিত।
মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে বস্ত্রদান
মৃত ব্যক্তির ‘সাতদিন্যা’ অনুষ্ঠানের সময়ে ভিক্ষুসংঘকে আমন্ত্রণ করে মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সংঘদানে প্রদত্ত দানীয় বস্তুসামগ্রী ভিক্ষু-শ্রামণদের ব্যবহারের উপযোগী হওয়া উত্তম। কিন্তু সেখানে যদি পেনুন-খাদি, চিরুনি, প্রসাধনী সামগ্রী, শার্ট, প্যান্ট, সোনা-রূপার অলঙ্কার, গবাদি পশু দান করা হয়, তাহলে সেগুলো ভিক্ষুসংঘ গ্রহণ করে কী করবেন? আমাদের উচিত বিনয়সম্মত দানীয় বস্তু ভিক্ষুসংঘকে দান করা।
ঘিলা-কচোই পানি
ঘিলা-কচোই এর জলে শুদ্ধ বা পবিত্র হওয়ার রীতি সুপ্রাচীন। এই জল পায়ে ছিটালে কিভাবে লোকে পবিত্র হয়? শ্মশান হতে ফেরার সময়ে সেখানে রাখা ঘিলা-কচোই এর চোঙা হতে পায়ে তিন বা ততোধিক ফোটা জল নেয়ার প্রথা প্রচলিত রয়েছে। নবজাতকের জন্মের পর হতে নাভি ছেঁড়া পর্যন্ত সে অপবিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। এই সময়ে যারা তাকে ধরবে বা কোলে নিবে সে অপবিত্র হয়। এই অপবিত্র শরীর নিয়ে ক্ষেত-খামারে গমন করারও অনুচিত। যদি একান্তই যেতে হয় তাহলে ঘিলা-কচোই এর জলে পবিত্র হয়ে তবেই ক্ষেত-খামারে গমন করতে হয়। এ সকল প্রথা অবৌদ্ধ আচরণ। এগুলো পরিহার করা উচিত।
উপরে উল্লেখিত বৌদ্ধ ও অবৌদ্ধ আচরণ ছাড়াও আরও অনেক আচার-প্রথা তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে প্রচলিত রয়েছে। সেসব প্রথা হতে গুটিকয় প্রথা এখানে তুলে ধরা হয়েছে। একজন বৌদ্ধ হিসেবে সকল অবৌদ্ধ আচরণ পরিহার করে বৌদ্ধধর্ম সম্মত প্রথা প্রচলন করা উচিত। আধুনিক শিক্ষিত তঞ্চঙ্গ্যা প্রজন্মকে সেই দায়িত্ব কাঁধে নিতে হবে। প্রবীন তঞ্চঙ্গ্যাগণ যদি সেই প্রথা হতে বেরিয়ে আসতে না চান, তাদের জোর করা উচিত নয় (বর্তমানে আমাদের পরিবারে মা ছাড়া আর কেউ চুমুলাংপূজা, বোরপারা প্রভৃতি পূজা করে না)। বরং নিজেকে সেই প্রথা হতে বের করে এনে উত্তরসূরীদের বৌদ্ধধর্ম সম্মত আচরণ অনুশীলনে উৎসাহিত করা উচিত।
[এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল “ধর্মদূত” নামক স্মারকগ্রন্থে যা ধম্মাবিজয়া বুদ্ধমূর্তি অভিষেক উদযাপন পরিষদ, রাজস্থলী, রাঙ্গামাটি কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছিল ১৪ মার্চ ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে]




