চন্দ্রসেন তঞ্চঙ্গ্যা
[প্রবন্ধটি বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা ওয়েলফেয়ার ফোরামের মুখপত্র উদয় তঞ্চঙ্গ্যা সম্পাদিত ‘আওইত্’ লিটল ম্যাগের দ্বিতীয় সংখ্যায় ২৮-৩৫ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশকাল: আদিবাসী দিবস, ২০২৫। গুরুত্ব বিবেচনায় প্রবন্ধটি পুনরায় অনলাইনে প্রকাশিত হলো।]
একটি ভাষার সবচেয়ে ছোট্ট জ্ঞান ভাÐার হচ্ছে সেই ভাষার প্রবাদ। এর ভাষা খুবই অল্প কিন্তু জ্ঞানের পরিসর বিশাল। জনজীবনে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা থেকে উৎপন্ন জ্ঞানের সারসংক্ষেপ হচ্ছে সেই ভাষার প্রবাদ। প্রবাদ দ্বারা বুঝতে পারা যায় সেই জাতি বা সমাজ কোন কোন ঘটনা বা দুর্ঘটনার ভেতর দিয়ে বর্তমান সময়ে এসে পৌঁছেছে। তাছাড়া সে ভাষার লোকেদের পাণ্ডিত্য, ছন্দজ্ঞান প্রভৃতি সম্পর্কেও প্রবাদ হতে জানা যায়। প্রবাদ হলো সেই ভাষাভাষী জনসমাজের প্রচলিত লোক-সাহিত্য।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বসবাস রত তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী জনসংখ্যায় কম হলেও এদের ভাষায় প্রচলিত প্রবাদের পরিমাণ বেশ সমৃদ্ধ। তঞ্চঙ্গ্যা প্রবাদ নিয়ে ইতোপূর্বে দুটি স্বতন্ত্র পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। পুস্তক দুটি হচ্ছে-
(১) গ্রন্থের শিরোনাম : তঞ্চঙ্গ্যা প্রবাদ
লেখক : চন্দ্রসেন তঞ্চঙ্গ্যা
প্রকাশকাল : ১ এপ্রিল ২০১৭
প্রকাশক : সুমনা তঞ্চঙ্গ্যা, রাঙ্গামাটি
(২) গ্রন্থের শিরোনাম : তঞ্চঙ্গ্যা দাঅ কধা (তঞ্চঙ্গ্যা প্রবাদ)
লেখক : লগ্ন কুমার তঞ্চঙ্গ্যা
প্রকাশকাল : ৯ আগস্ট ২০২১
প্রকাশক : আইত পিবা ইন্টার মিডিয়া, রাঙ্গামাটি
এ সকল পুস্তক ছাড়াও কিছু পুস্তকে তঞ্চঙ্গ্যা প্রবাদ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এবং কিছু কিছু তঞ্চঙ্গ্যা প্রবাদ উল্লেখ করা হয়েছে। সে সকল পুস্তকগুলো হচ্ছে-
(১) গ্রন্থের শিরোনাম : তঞ্চঙ্গ্যা জাতি
লেখক : রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যা
প্রকাশকাল : এপ্রিল ২০০০
প্রকাশক : লেখক, বান্দরবান
পৃষ্ঠা নম্বর : ৭০-৮১
(২) গ্রন্থের শিরোনাম : তঞ্চঙ্গ্যা জাতি সমাজ ও সংস্কৃতি
লেখক : ড. মাযহারুল ইসলাম তরু
প্রকাশকাল : ফেব্রæয়ারি ২০২৩
প্রকাশক : আপন প্রকাশ, ঢাকা
পৃষ্ঠা নম্বর : ৭৯-৯৪
(৩) গ্রন্থের শিরোনাম : তঞ্চঙ্গ্যা ফোকলোরোগ্রাফি
লেখক : ড. শেখ মকবুল ইসলাম
প্রকাশকাল : ১ সেপ্টেম্বর ২০২৩
প্রকাশক : রিসার্চ পাবলিকেশন, কলকাতা
পৃষ্ঠা নম্বর : ৯৭-১৩২
(৪) গ্রন্থের শিরোনাম : বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তঞ্চঙ্গ্যা ও পাঙ্খোয়া
লেখক : মুস্তাফা মজিদ
প্রকাশকাল : অক্টোবর ২০২৪
প্রকাশক : বাংলা একাডেমি, ঢাকা
পৃষ্ঠা নম্বর : ১২৪-১২৭
কিছু লিটল ম্যাগাজিনেও অনেকে বিভিন্ন সময়ে কিছু তঞ্চঙ্গ্যা প্রবাদ প্রকাশ করেছিলেন। প্রবাদ সম্পর্কে জনসাধারণের কৌতুহল ব্যাপক। তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার লোক-সাহিত্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও গবেষণা হয়েছে ‘তঞ্চঙ্গ্যা প্রবাদ’ নিয়ে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
তঞ্চঙ্গ্যা প্রবাদসমূহ বিভিন্ন শ্রেণী বা ক্যাটাগরিতে বিন্যস্ত করা যায়। যেমন- চারিত্রিকি, সামাজিক, ধর্মীয়, অপবাদ, ঋতুভিত্তিক, প্রকৃতি সম্পর্কীয়, সাধারণ জ্ঞান, বিবাহ সম্পর্কিত, সময় বিষয়ক, প্রেম/যৌবন বিষয়ক, কায় সম্পর্কিত, রোগ বিষয়ক প্রভৃতি। ড. শেখ মকবুল ইসলাম তাঁর ‘তঞ্চঙ্গ্যা ফোকলোরোগ্রাফি’ গ্রন্থে তঞ্চঙ্গ্যা প্রবাদের ৩২টি শ্রেণীর কথা বলেছেন। এ প্রবন্ধে তঞ্চঙ্গ্যা প্রবাদের কিছু শ্রেণী নিয়ে উদাহরণসহ আলোচনা করা হলো।
֍ ঋতু সম্পর্কিত প্রবাদ:
১. র্জা কাল্যা বেল্
হালালে গেল্।
শীতকালে সূর্য দুপুর গড়ালেই সন্ধ্যা হয়ে যায়।
২. ভাদ মাইস্যা কাম্
পুনে মুএ ঘাম্
চুঅ মাছি ধাবার্বা সময়্ নাই।
ভাদ্র মাসে জুমিয়াদের কাজের চাপ অধিক হয়ে থাকে এবং ক্ষণমাত্র অবসরের সময় নেই – এটা বুঝাতে উল্লেখিত প্রবাদ ব্যবহৃত হয়।
৩. মাঘ জারত্ বাঘ্ গুচুরন্।
মাঘের শীতে বনের বাঘ শীতে গর্জন করে। মাঘ মাসের শীতের তীব্রতা বুঝাতে এই প্রবাদটি ব্যবহৃত হয়।
֍ বার্ধক্য সম্পর্কিত প্রবাদ:
৪. কাইন্যা কুরে ভাঁ গাইট্,
নিত্য গরে টাইত্ টাইত্।
খাদের কিনারে ভাঙা গাছ, নিত্য করে ঠাসঠাস। এই প্রবাদের দ্বারা বৃদ্ধকালে মানুষের আকস্মিক অসুস্থতা ও আসন্ন মৃত্যুর কথা প্রকাশিত হয়ে থাকে। বয়োবৃদ্ধকালে মৃত্যু এসে কখন গ্রাস করে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সুতরাং আসন্ন মৃত্যু সম্পর্কে সকলের মনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা লেগে থাকে।
৫. বুরা উলে চিয়ন্ পআ ধক্।
বৃদ্ধ বয়সে সকলে শিশুতুল্য। এই প্রবাদের দ্বারা বৃদ্ধকালে মানুষের স্বভাব ও চেতনার কথা উক্ত হয়ে থাকে।
৬. দাত্ গেল্ বেলে সআদ গেল্,
চুগ্ গেল্ বেলে দুনিয়াঅ গেল্।
দাঁত খসে পড়লে স্বাদও চলে যায়, দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গেলে দুনিয়াও অন্ধকার হয়ে যায়। এই প্রবাদের দ্বারা বৃদ্ধ বয়সে মানুষের চিরায়ত দুর্দশার কথা বলা হয়েছে। বৃদ্ধকালে মানুষের দাঁত খসে পড়ে। পর্যাপ্ত দাঁত না থাকায় তাঁরা খাবারে স্বাদ খুঁজে পায় না। অপরদিকে দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে থাকে। কখনো কখনো দৃষ্টিশক্তি একেবারেই থাকে না। তখন তাঁদের নিকট জগৎ সংসার চির অন্ধকার হয়ে যায়।
֍ প্রেম বা যৌবন সম্পর্কিত প্রবাদ:
৭. পালে মালে লাঙে মন্
দুইজ্যা সাসুরে কদক্খণ্?
এই প্রবাদের দ্বারা প্রেমিক হৃদয়ের সামর্থ্য ও প্রেরণা সম্পর্কে বিবৃত করা হয়। মানুষ প্রেমে পড়লে সকল অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা করে। সহস্র মাইল বা অকূল দরিয়া পার হয়ে হলেও সে কাক্সিক্ষত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
৮. গাভুরান্ যুনি ভাগ্বায়্
দেত্ গাঙ্ ন কুলায়্।
এই প্রবাদের দ্বারা এটাই বুঝানো হয় যে, যৌবন যদি উথলে উঠে তবে দেশ কিংবা নদী তার কাছে কিছুই না। শত প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে সে মনের মানুষের দ্বারে গিয়ে উপস্থিত হবেই।
֍ বিবাহ সম্পর্কিত প্রবাদ:
৯. কলাপাদাত্ বেলে পোই পারে,
এক্ কাইত্যিন্ সাং খালে লোই পারে।
তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে বিবাহের জন্য উপযুক্ত পাত্রী হচ্ছে দূর সম্পর্কীয় ভাই ও বোন। তবে দূর সম্পর্কীয় মাসি-পিসি-ভাতিঝি বা ভাগ্নিও বিয়ের উপযুক্ত। এটা বুঝাতে উক্ত প্রবাদটি ব্যবহৃত হয়।
১০. আদা লাহায়্ বেলে বালা খায়্,
লুলে গর্রোয়া কুদুম্ ভালা খায়্।
শুধু কি দূর সম্পর্কীয় ভাই-বোনের মধ্যে বিবাহ হলে সংসার সুখের হয়? বরং দূর সম্পর্কীয় মাসি, পিসি, ভাতিঝি বা ভাগ্নিকে বিয়ে করলেও সংসার জীবন সুখের ও উন্নত হয়ে থাকে এটা বুঝাতে এই প্রবাদটি উদ্ধৃত হয়ে থাকে।
১১. মুলাপুত্ ভাই পিসাঙাঝি বোইন্,
গুই এহ্রা মিসায়া বিয়োইন্ চন্।
এই প্রবাদের দ্বারা বুঝানো হয় যে, মামাতো-পিসিতো ভাই-বোনের সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর হয়ে থাকে এবং তাঁদের বৈবাহিক জীবন চিরকাল আনন্দদায়ক ও সুখের হয়ে থাকে।
১২. পদ্ ভালা বেঞা যোক্,
র্ঘ ভালা দুরত্ যোক্।
বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে বহুদূরের পাত্রীও উত্তম বুঝাতে উল্লেখিত প্রবাদটি ব্যবহৃত হয়।
֍ চারিত্রিক লক্ষণ সম্পর্কিত প্রবাদ:
১৩. গাইট্ চিনে বাঅলে,
মানোইত্ চিনে আক্কলে।
বাকলের দ্বারা গাছের অবস্থা জানা যায়, তেমনি আচার-ব্যবহার দেখে মানুষের চরিত্র চেনা যায়।
১৪. চুরত্তুন্ ভক্তি বেইত্।
অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ।
১৫. যি কূর নিঞুল্ বেঞা
চুমাত্ ভরালেয় বেঞা।
যে কুকুরের লেজ বাঁকা, চোঙায় ভরালে বাঁকা থাকে। অর্থাৎ কুটিল মানুষের স্বভাব কখনো পরিবর্তিত হয় না।
֍ আয়-ব্যয় সংক্রান্ত প্রবাদ:
১৬. গুলা ভরে গাইট্ লঞে।
ফলের ভারে গাছ নুয়ে পড়ে। পরিবারে জনসংখ্যা বাড়লে আয়ের উপর চাপ পড়ে – এটা বুঝাতে এই প্রবাদটি আওড়ানো হয়।
১৭. আয় বুসি খা,
মুসঙান চা।
আয় বুঝে ব্যয় কর।
֍ পরিণাম সংক্রান্ত প্রবাদ:
১৮. অপধ ধন্ পানিত্ যায়্।
অন্যায়ভাবে উপার্জিত ধন জলে ভেসে যায়।
১৯. চুর্র দইত্ দিন্
গিরির্ত্থ এক্দিন্।
চোরের দশদিন, গৃহস্থের একদিন। দশদিন চুরি করে খেলেও একদিন অবশ্যই এর মাশুল দিতে হয়।
֍ অপবাদ বা নিন্দা জ্ঞাপক প্রবাদ:
২০. কার্রোয়া গছা কুহ্রা লাইত্।
এই প্রবাদটি মূলত তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর কার্রোয়া গছার লোকজনকে নিন্দা জানাতে ব্যবহৃত হয় যার অর্থ হচ্ছে: কার্রোয়া গছার লোকজন নির্লজ্জ।
২১. ধন্যাগছা তুন্যা কাসি
ধুন্দা মচা তুবি বাসা।
এই প্রবাদের দ্বারা ধন্যাগছার লোকজনকে অপবাদ দেয়া হয়। অপবাদটি হচ্ছে: ধন্যাগছার লোক অশিক্ষিত। তারা সবসময় নেকড়া পরে থাকে। সবসময় তামাক ও হুক্কা পান করে।
২২. মগ্ আল্সি ঠাঁর্উ,
তঞ্চঙ্গ্যা আল্সি ফাত্তোয়া,
চাংমা আল্সি রাইত্নিতি।
এই প্রবাদের দ্বারা মগ বা মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও চাকমা জনগোষ্ঠীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করা হয়ে থাকে। প্রবাদের মতে, আলস্যবশত মগেরা ভিক্ষু হয়, তঞ্চঙ্গ্যারা কেবল যত্রতত্র ঘুরে বেড়ায় কিন্তু চাকমারা রাজনীতি করে।
২৩. বাঙালরে মা দিনে বাপ্ নয়্,
ঝি দিনে জামাই নয়্,
বোইন্ দিনে বুন্নোয়া নয়্।
এই প্রবাদের দ্বারা বাঙালি জাতির প্রতি তঞ্চঙ্গ্যাদের চির অবিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে। বলা হচ্ছে- বাঙালিকে মায়ের জোরে পিতা, কন্যার খাতিরে জামাতা কিংবা বোনের খাতিরে দুলাভাই ডাকা যায় না। অর্থাৎ তারা কখনো বিশ্বাযোগ্য নয়।
֍ নারী সংক্রান্ত প্রবাদ:
২৪. ঘর লুক্খী মেলা জাত্।
নারীরা হলো ঘরের ল²ী।
২৫. মেলাত্তুন্ যিদি যায়্, সিদি র্ঘ।
নারী যেখানে যায়, সেটাই তার বাড়ি।
২৬. মেলা মন্ দেবেদায় ন বুশে।
নারীর চিত্ত দেবতারও অজ্ঞেয়।
২৭. গাভুজ্যা মেলা পআ বাচর মাল ধক্
যে দেহে তে মুলাবাক্কে কধা।
যুবতী নারী বাজারের মালের মতো, যে দেখে সে দরদাম করতে চাইবে।
২৮. মেলা উলাক্কে পরেয়া ঘর তোইত্ বারেং।
নারী হলো পরের ঘরের তুষের ঝুড়ি।
২৯. মেলায়্ রেইং কাইল্যে ভাদ রাদ্ পরে।
নারী উল্লাস করলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।
৩০. মেলায়্ বেলে ভএ পালে রাচারেয় গলামি খাদান্।
নারী যদি সুযোগে পায় তবে রাজাকেও গোলাম বানায়।
৩১. মেলা কবাল্ আওইন্ সালত্।
নারীর ভাগ্য উনুনশালায়। অর্থাৎ সারাজীবন ধরে নারীকে রান্নাবান্না করেই কাটাতে হয়।
৩২. মেলাত্তুন্ গাঙ্ দিহিলে মুদা আইসে,
লাং দিহিলে হাসা আইসে।
গাঙ দেখলে নারীদের প্র¯্রাবের বেগ পায় এবং প্রিয় কোনো পুরুষকে দেখলে হাসি পায়।
֍ আন্তরিকতা সম্পর্কিত প্রবাদ:
৩৩. আইচ্ছ্য তমা আওসে,
যাবা আমা আওসে।
তঞ্চঙ্গ্যাগণ অতিথি আপ্যায়নের ব্যাপারে খুবই আন্তরিক। অতিথি নিজের ইচ্ছায় কারও বাড়িতে গেলে গৃহস্থ না চাইলে চলে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটা বুঝাতে এই প্রবাদ আওড়ানো হয়।
৩৪. যা পরে নিজ আওসে,
আসা পরে গিরির্ত্থ আওসে।
মেহমান হয়ে যেতে হয় নিজের ইচ্ছায়, কিন্তু ফিরতে হয় গৃহস্থের ইচ্ছায়।
֍ আত্মীয়তা সম্পর্কিত প্রবাদ:
৩৫. দুর কুদুম্ ফুল বাইত্,
কায়া কুদুম্ ভদর বাইত্।
দূরের আত্মীয়দের প্রতি লোকের আন্তরিকতার শেষ নেই। কিন্তু প্রতিবেশী আত্মীয়দের বেলায় সেই আন্তরিকতা থাকে না।
֍ গুণাগুণ সম্পর্কিত প্রবাদ:
৩৬. ফুল বাইত্ বুয়ারে নিচায়্,
মাইন্স্য বাইত্ মাইন্সে নিচায়্।
ফুলের সুবাস বাতাসে ছড়ায়, মানুষের প্রশংসা/নিন্দা মানুষের মাধ্যমে ছড়ায়।
৩৭. নুন্ খাইনে গুণ্ চিনা পরে।
নুন বা লবণ খেয়ে তার গুণ চিনতে হয়।
৩৮. জুর থালে গুণ্ গরে,
ভাঙি কুলে কিরিং গরে।
পরের মন্দ দিক নিয়ে যতক্ষণ চুপ থাকা যায় ততক্ষণ তা উপকারে আসে। কিন্তু অপবাদ ছড়ালে তা থেকে বাদ-বিবাদের সৃষ্টি হয়।
֍ বাস্তবজ্ঞান সম্পর্কিত প্রবাদ:
৩৯. এক্ হাদে তালি ন বাজে।
এক হাতে তালি বাজে না।
৪০. সুদা কুমত্ আবাইত্ বেইত্।
খালি কলসি বাজে বেশি।
৪১. যি কূরে ঘা¹ায়্
সি কূরে ন কামারায়্।
ঘেউ ঘেউ করা কুকুর কদাচিত কামড়ায়।
৪২. উচু আঁউলে ঘি ন উদে।
সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না।
֍ কর্ম সংক্রান্ত প্রবাদ:
৪৩. কাম্ শুর্ত্তু গুইল্যে ফুরায়্,
মানোইত্ শুর্ত্তু মুইল্যে ফুরায়্।
কাজ শুরু করলে তা একসময় শেষ হয় এবং মানুষ মরে গেলেই তার শত্রæতার শেষ হয়।
৪৪. আল্স্যা কধা কয়্,
কাম্মোআয়া কাম্ ধুনে।
অলস ব্যক্তি গল্পগুজব করে দিন কাটায়, কিন্তু কর্মঠ ব্যক্তি স্ব-কাজে সময় ব্যয় করে।
৪৫. কাম্ জানিলে ভাদে ন মরে।
হাতের কাজ যে জানে, তার জীবিকার অভাব হয় না।
উপরে উল্লেখিত শ্রেণী ছাড়াও প্রচলিত তঞ্চঙ্গ্যা প্রবাদসমূহকে আরও বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভাজিত করে আলোচনা করা সম্ভব। কিছু প্রবাদ আছে, যেগুলো কেবল তঞ্চঙ্গ্যা জাতি সম্পর্কিত এবং তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার সিংহভাগ প্রবাদ সর্বজনীন। ভাষাগত বৈচিত্র্য ব্যতীত এসব প্রবাদ বিশে^র বিভিন্ন ভাষার প্রবাদের সাথে ভাবগত, কিছু ক্ষেত্রে ভাষাগতও মিল রয়েছে। তঞ্চঙ্গ্যা প্রবাদসমূহে বিদ্যমান ছন্দজ্ঞানও যথেষ্ট প্রশংসনীয়। কলেবর বেড়ে যাওয়ায় এই প্রবন্ধে তা নিয়ে আর আলোচনা বাড়ানো হলো না। সুযোগ হলে প্রবাদ অনুসারে তঞ্চঙ্গ্যাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা বা ঘটনা-দুর্ঘটনা এবং তঞ্চঙ্গ্যা প্রবাদের ছন্দ নিয়ে আলোচনার আশা রাখি।
লেখক পরিচিতি:
শিক্ষক ও সাহিত্যিক, ওয়াগ্গা, কাপ্তাই, রাঙ্গামাটি।




