কর্মধন তঞ্চঙ্গ্যা
ছোট বেলা থেকে দেখে এসেছি বাবা, মা খুব ভোরবেলা মোরগ ডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন। রান্না-বান্না করে দু’টো খেয়ে এবং সাথে কলা পাতা দিয়ে মোড়ানো ভাত এবং তরকারি ছোট একটা হাল্লাঙ করে মাথায় নিয়ে জুমের উদ্দেশ্য রওনা দিতেন। পথে ছড়া থেকে বাঁশের চুমায় করে খাবার পানি নিয়ে যেতেন। প্রতিবেশীরাও এভাবে প্রতিদিন নিজেদের মতো করে জুমে আসা-যাওয়া করতেন। তাদের জুমের এই ব্যস্ততা শুরু হয় চৈত্র মাসের আগে থেকেই। জুম কাটার জন্য প্রতিবেশীর সাথে আলোচনা, জায়গা নির্বাচন, জুম কাটা, জুমে আগুন দেওয়া, জুম পরিস্কার করা এবং ফসল রোপনের মধ্য দিয়ে জুমের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতো আর শেষ হতো হলুদ উত্তোলনের পর। তবে যারা কলা গাছ রোপন করতো তাঁরা পরবর্তী আরও ২/৩ বছর পর্যন্তও কলাসহ ধান্যা মরিচ, জুম বেগুন পেতো। পুরোটা বছর বিরামহীন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে দেখেছি আমি সকলকে। এই জুমকেই কেন্দ্র করে তাদের জীবন এবং বেঁচে থাকার আপ্রাণ প্রচেষ্টা। জুমই ছিল তাদের একমাত্র অবলম্বন ছিল।
আমি যে সময়কার কথা বলছি- তখন বিনোদন বলতে সামাজিক এবং ধর্মীয় কিছু উৎসব ছিল। রেডিও ছিল অনেকের ঘরে ২/৩/৪/৫ বেইনের। অনেকের কাছে ক্যাসেট প্লেয়ারও ছিল। জনগোষ্ঠী বেইজ পাহাড়িকা অনুষ্ঠান সম্প্রচার হতো রেডিওতে। ছায়াছবিী ছায়াছন্দ গান হতো, সাথে হতো অনুরোধের গানের আসর। তখন দিদিদের দেখতাম এই রেডিও নিয়ে কাড়াকাড়ি করতো। একদিকে কোমড় তাঁত বোনা অন্যদিকে রেডিওতে গান শুনার প্রবল আগ্রহ স্রোতের সে এক অন্য রকম অনুভূতি। আমার নিজেরও মনে আছে আমাদের বাড়ির রেডিওটি গলায় ঝুলিয়ে গান শুনতাম কাউকে ধরতে দিতাম না। কিছু স্বচ্ছল পরিবারে সাদা-কালো টিভি ছিল, এই টিভি দিয়ে ভিসিআর দেখতাম সকলে দলবেঁধে।
বিষু উৎসব, আহলপালানী, জুমের নতুন ভাত খাওয়া, সন্তানের আর্শীবাদ বা মানস পালন করে দেওয়া, বিয়ে উৎসব, কসই পানি নেওয়া, গিঙ্গুলী গানের পালা, কীর্তন, সিন্নি খাওয়া আর বুদ্ধ পূর্ণিমা, প্রবারণা পূর্ণিমা (ফানুস উত্তোলন উৎসব), আষাঢ়ী পূর্ণিমা, কঠিন চীবর দানোৎসব এই সামাজিক এবং ধর্মীয় উৎসবগুলো ছিল তখন গ্রামের অন্যতম ও প্রধানতম উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে। এসকল অনুষ্ঠানে গ্রামের মানুষরা উৎসবমুখর পরিবেশে একত্রিত হতো, আনন্দ করতো, খাওয়া-দাওয়া করতো।
আহলপালানী উৎসব প্রসঙ্গ নিয়ে নিতে কথা বলছিলাম, বাংলা সনের আষাঢ় মাসের ৭ তারিখে তঞ্চঙ্গ্যারা আহলপালানী উৎসবটি পালন করে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামে আরো অনেক জনগোষ্ঠীও এই অনুষ্ঠানটি পালন করে থাকে। এই আহলপালানী অনুষ্ঠানটি একটি সামাজিক উৎসব যা প্রকৃতির সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। জনশ্রুতিতে আছে এই দিনে মা বসুমতী ঋতুবতী হন, এসময় তিনি শারীরিকভাবে যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়েন। তাঁর এই অসুস্থতাকে নারী জাতির প্রতি ভক্তি,সন্মান, শ্রদ্ধাবোধ রেখে এই দিনে তাঁকে পূর্ণ বিশ্রামে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। এই আহলপালানী তাই যতোটা স্বার্থিক ততোটা মানবিক, সন্মান, শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার। এই দিনে জুমিয়ারা কাজে না গিয়ে পূর্ণ দিবস বিশ্রাম নেয়, বসুমতীকে কর্ষণ করা থেকে বিরত থাকে। মা বসুমতী যেন কোন আঘাত, ব্যাথা বা মনোকষ্ট না পান সেটিও সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে খেয়াল রাখা হয়। শুধু বসুমতী নয় তাঁর সাথে জড়িয়ে থাকা সকল পোকামাকড়, কীটপতঙ্গদের জীবন রক্ষার একটা ব্রত থাকে এই আহলপালানীকে ঘিরে। দা, কাঁচি, লাঙ্গল, ফাগারাসহ সকল চাষের উপকরণগুলোও এই দিনে বিশ্রাম পাই।
নবান্ন উৎসবে তাদের আহার বর্জ্য দিয়ে পূজা করারও প্রচলন রয়েছে এখনো সমাজে। সকালে গোসল ছেড়ে পবিত্র হয়ে মা বসুমতীর উদ্দেশ্য পূজা দেওয়ার মধ্য দিয়ে আহলপালানী উৎসবের আনুষ্ঠানিকতার পর্ব শুরু হয়। একটা সর্বজনীন উৎসবের মাধ্যমে বসুমতীকে বিশ্রাম দেওয়া হয়, এটিও আহলপালানীর অন্যতম বিশেষত। তাই আহলপালানী হচ্ছে নতুন উদ্যোম, উদ্যোগ এবং নতুনের সৃষ্টি সাথে সৌহার্দ্য, কৃতজ্ঞতা, পবিত্রতা এবং দায়িত্বের প্রতীক। সাথে সামাজিক, পারিবারিক ঐক্য, সম্প্রীতি এবং ভ্রাতৃত্বের প্রতীকও।
এই আহলপালানীর সাথে ‘হাল’ বা জমিতে হালচাষের একটা সম্পর্ক আছে। কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছি পাহাড়িদের চাষাবাদ এবং সংস্কৃতির বিরাট একটি অংশজুড়ে রয়েছে “জুম সংস্কৃতি”। তাই “আহলপালানী” শব্দ চেয়ে “জুমপালানী” শব্দটি আমার পছন্দ (তবে সংস্কৃতিজাত নাম পরিবর্তনের পক্ষে আমি নয়)।
উৎসবের সাথে খানাপিনার যোগসূত্র ছিল বহু প্রাচীনকাল থেকেই। এই আহলপালানী উৎসবেও প্রতিটি ঘরে ঘরে আয়োজন করা হয় খানাপিনা এবং পিঠাপুলির। সাইন্যা, বিনি, মালি, কলা, আলসী পিঠার আয়োজন হতো। এসময় পুরো গ্রামময় উৎসবে ভরে উঠে। একে অপরকে দাওয়াত দেয় ঘুরাঘুরি করে সকলে মিলে দলবেঁধে এই ঘর থেকে ঐ ঘরে। যাঁরা আগেভাগে ফসল ফলাতে পারতো তাঁরা মারফা, জুমের ভুট্টা খেতে পারতো এই সময়। মেহমানদেরও দেওয়া হতো।
এভাবে নানা আয়োজন, খাওয়া দাওয়া এবং বিশ্রামের মধ্য দিয়ে মা বসুমতীকে স্মরণ করে আহলপালানী উৎসবটি পালন করা হয়। পরেরদিন সকলে আবার নতুন উদ্যোমে, নতুন উৎসাহে এবং শক্তি নিয়ে কাজে নেমে পড়ে বসুমতীকে সাজিয়ে তোলার জন্য। আর অপেক্ষায় থাকে আগামী বছরের আহলপালানীর জন্য। মা বসুমতীকে যত্ন নেওয়ার জন্য, হৃদয় এবং আত্না দিয়ে উপলব্ধি করার জন্য, সুস্থ থাকার সহযোগিতা করার জন্য।
কর্মধন তঞ্চঙ্গ্যা: প্রকাশক, সাহিত্যিক এবং গীতিকার।
——————-




