তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের শবদেহ সৎকার

লিখেছেন: চন্দ্রসেন তঞ্চঙ্গ্যা, পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম স্বনামধন্য কবি ও সাহিত্যিক।

[প্রবন্ধটি বাংলাদশে তঞ্চঙ্গ্যা স্টুডন্টেস ওয়লেফয়োর ফোরাম মুখপত্র উদয় তঞ্চঙ্গ্যা সম্পাদিত ‘আওইত্’ লিটল ম্যাগের দ্বিতীয় সংখ্যায় ৫০-৫৮ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশকাল: আদিবাসী দিবস, ২০২৫। সামান্য সংশোধন ও ছবিযুক্ত করে প্রবন্ধটি পুনরায় অনলাইনে প্রকাশিত হলো।]

বাংলাদেশে বসবাসকারী আদিবাসী জাতিসমূহের মধ্যে তঞ্চঙ্গ্যা অন্যতম। তাদের প্রধান বসতিসমূহ বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় গড়ে ওঠেছে। চট্টগ্রাম জেলার পার্বত্য জেলা সংলগ্ন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা ও কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় কিছু সংখ্যক তঞ্চঙ্গ্যা পরিবারের স্থায়ী বসতি রয়েছে।
নৃতাত্তি¡ক বিবেচনায় তঞ্চঙ্গ্যা জাতি মঙ্গোলীয় নৃগোষ্ঠীর একটি শাখা। এদের ভাষা ইন্দো-আর্য ভাষার একটি শাখা। এটি একটি স্বতন্ত্র ভাষা। তারা প্রধানত বৌদ্ধ ধর্ম পালন করে। বৌদ্ধ ধর্মের পাশাপাশি আদিকাল থেকে সনাতন ধর্মের আদলে বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা ও পৌত্তলিক পূজা-অর্চনাও তাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। বৌদ্ধধর্ম, সনাতন ধর্ম ও পৌত্তলিক প্রথার সংমিশ্রণে এক মিশ্রণ সংস্কার তাদের দৈনন্দিন জনজীবনে বিরাজমান।
তাদের সমাজে তিন ধরনের সংস্কার প্রচলিত রয়েছে। যথা- (১) নবজাতক সংক্রান্ত, (২) বিবাহপ্রথা সংক্রান্ত, (৩) মৃত সৎকার সংক্রান্ত। এগুলো প্রধান সংস্কার। এছাড়াও (৪) মূ বারানি, (৫) খাদি পোই, (৬) ধুদি পোই, (৭) খানা পোই, (৮) বোরপারা নামক এই পাঁচ ধরনের সংস্কারও প্রচলিত রয়েছে বা ছিল। এই নিবন্ধে “তঞ্চঙ্গ্যা জাতির মৃত্যু সংস্কার” নিয়ে আলোচনা করা হবে।

তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে মৃতসৎকারে সুনির্দিষ্ট কিছু আচারপ্রথা রয়েছে। তঞ্চঙ্গ্যা জাতির কৃষ্টি-সংস্কৃতি, শৃঙ্খলা ও উন্নতি রক্ষা কল্পে এসব আচারপ্রথা অবশ্যই পালনীয়। এসব আচারপ্রথাকে বেশ কয়েকটি ভাগে বর্ণনা করা যায়। যেমন-

(ক) মৃত্যুর পূর্বে করণীয়:
সাধারণত মরণাপন্ন যেকোনো ব্যক্তিকে মৃত্যুর পূর্বে তাঁর সকল আত্মীয় স্বজন দেখা করার চেষ্টা করেন। পরিবারের লোকজনও দূরে কোনো ইষ্ট কুটুম্ব থাকলে খবর পাঠান। সকলে এসে তাঁর সাথে সুখ-দুঃখের শেষ আলাপ ও আশীর্বাদ কামনা করেন। বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ থাকলে পরকালে সুগতি কামনা করে আশীর্বাদ করে যান। যদিও এ ধরনের কার্যক্রম দৃষ্টিকটু, কিন্তু শয্যাশায়ী ব্যক্তির অবস্থা বিবেচনা করে তাঁরা এসব করতে বাধ্য হন।
মরণাপন্ন ব্যক্তিকে সাধ্যমতো তাঁর চাহিদা অনুসারে খাওয়ানো হয় এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের চেষ্টা করেন। অনেকের বিভিন্ন পবিত্র স্থানে বিভিন্ন মানত থাকে। তাঁর পরিবার ও আত্মীয়বর্গ সেসব মানত পূর্ণ করার চেষ্টা করেন। মরণ-শয্যায় শায়িত ব্যক্তিকে তাঁর নিকট আত্মীয় যেমন- স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, পুত্রবধু-জামাতা, নাতি-নাতনীরা শেষবার জলপান করানোর চেষ্টা করেন। যার জল পান করে মরণাপন্ন ব্যক্তি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তাঁকে অত্যন্ত ভাগ্যবান বলে বিবেচনা করা হয়।
মরণাপন্ন কোনো ব্যক্তি যদি দীর্ঘকাল মরণ দুঃখ ভোগ করে তাহলে উক্ত ব্যক্তির মঙ্গলের উদ্দেশ্যে বাড়িতে ভিক্ষুসংঘ এনে ত্রিপিটক হতে মঙ্গলসূত্র পাঠ করে শোনানো হয়। সূত্রপাঠের ফলে অনতিবিলম্বে অনেকের কালপ্রাপ্তি হয় বলে তঞ্চঙ্গ্যাগণ বিশ্বাস করেন।

(খ) মৃত্যুর পরে করণীয়
মৃত্যুর পরপরই শবকে সোজা হয়ে শোয়ানো হয়। শবের মুখে প্রবেশ করানো হয় একাধিক রূপার মুদ্রা। এর নাম ‘মুঅ তাঙা’ বা ‘মুঅ টেঞা’। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি বা নিকট আত্মীয়রা এ কাজটি করে থাকেন। শবের চোখের পাতা বন্ধ করে দেয়া হয়। শবকে ঘরে রাখার জন্য সদ্য কেটে আনা তাজা বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয় অস্থায়ী খাট। এটি ‘বিয়াঘর’ নামে পরিচিত। এটি ঘরের বারান্দা বা সুবিধাজনক স্থানে বসানো হয়। এর উপর ঢেকে দেওয়া হয় একটি সাদা কাপড়।
সাধারণত মাঝরাতের পরে ও দুপুর বারোটার আগে শবকে অন্তিম স্নান করানো হয় না। ঘরের বাইরে সুবিধাজনক স্থানে তক্তা বা অন্য কিছুর উপর শবদেহকে শোয়ানো হয়। শবের শরীর থেকে খুলে ফেলা হয় সকল ধরনের তাবিজ-কবজ, আংটি বা অলঙ্কার প্রভৃতি। এমনকি তার শরীরে যদি কোনো মন্ত্রপূত কোনো কিছুও থাকে, তাও নষ্ট করা হয়। অতপর একেক কলসি সদ্য তোলা জল এনে শবের গায়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢালা হয়। অবশ্যই সাবান মেখে শবকে স্নান করাতে হয়। স্নাননের পূর্বে শবের নাকে ও কানে সাদা তুলা দিয়ে ছিদ্রগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় যেন তাতে জল প্রবেশ না করে। খেয়াল রাখতে হয়, শবের গায়ে যেন কোনো প্রকার ময়লা না থাকে। পুরনো কাপড় পাল্টে দিয়ে নতুন সাদা বস্ত্র পরানো হয়। স্নানশেষে শবকে তোলা হয় বিয়াঘরে। সাধারণত উত্তরশির বা পূর্বশির করে শবকে শোয়ানো হয়ে থাকে। অন্তিম স্নান করানোর আগে শবকে বিয়াঘরে তোলার রীতিও নেই।
বিয়াঘরের পাশে একটি নতুন মাটির কলস, ছোট্ট ঝুড়িতে মোমবাতি, আগরবাতি, দিয়াশলাই, সরিষার জীব, ভাতের মোচা, পানির চোঙা প্রভৃতি রাখা হয়। অনেকে মৃতের পাশে কিছু চাল ও মুড়ি রেখে দেন। সেসব চাল বা মুড়ি ছিটিয়ে আগত ইষ্ট কুটুম্বরা শবকে আশীর্বাদ বা প্রণাম করে থাকেন।

আত্মীয় ও হিতৈষীরা শবের বুকের উপর টাকা-পয়সা যার যেমন ইচ্ছা রেখে দিয়ে যায়। এই টাকাকে বলা হয় ‘বুগতাঙা’ বা ‘বুঅ টেঞা’। সাধারণত শবকে বাড়িতে এক বা একাধিক রাত্রি পর্যন্ত রাখা হয়। সাধ্য থাকলে এক রাতের জন্য বৌদ্ধ কীর্তনের ব্যবস্থা করা হয়। পূর্বাহ্ন সময়ে, বুধবারে ও অমাবস্যার দিন শবকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া রীতি শুদ্ধ নয়। সাধারণত ঘরে বাইরে কেউ মারা গেলে, শবকে ঘরে তোলা, গ্রামের বাইরে কেউ মারা গেলে গ্রামে প্রবেশ করানো প্রথা বিরুদ্ধ। কলেরা, ডায়রিয়ায় মৃত ব্যক্তিকে পোড়ানো হয় না, কবরস্থ করা হয়। এছাড়াও হাসপাতালে, নদীতে, বনে, সড়কে, যুদ্ধে প্রভৃতিস্থানে নানান দুর্ঘটনায় মৃতব্যক্তিকে বাড়িতে না এনে সরাসরি শ্মশানে নিয়ে পোড়ানো হয়ে থাকে।

প্রাসাইদ


দুধের শিশুকে কবরস্থ করা হয়। তবে এমনস্থানে কবরস্থ করতে হয় যেন তা প্রবহমান গাঙের ঐপাড়ে না হয়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুকে পোড়ানো রীতিসম্মত হয়। দোলনার শিশু হলে ব্যবহৃত দোলনাটিও কবরের উপরে উপুড় করে ঢেকে দিতে হয়।
মৃতের জন্য সাধারণত এক মুঠো চাল ও জঙ্গলী অখাদ্য লতাপাতা সিদ্ধ করে এর কিছু অংশ শবের মুখে গুঁজে দিয়ে, অবশিষ্টাংশ কলার পাতায় মোচা বেঁধে দেয়া হয়। দীর্ঘদিনের জন্য কোনো লোক দূরে যেতে হলে যেমন বাড়িতে ভাত খেয়ে আর একটা ভাতের মোচা সঙ্গে নিয়ে যায়, তদ্রæপ মৃত ব্যক্তিকেও কিছু খাইয়ে এক ভাতের মোচা সঙ্গে দেওয়া হয়।
শবকে গৃহ থেকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার আগে ভিক্ষুসংঘ এনে পঞ্চশীল গ্রহণ ও অনিত্য পাঠ করা হয়। রান্নাঘরের সমস্ত ছাই একটি ছোট ঝুড়ি বা পাত্রে নেয়া হয়। অতপর বাড়ির সকলে উঠোনে একত্রে বসলে গ্রামের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বী সেই ছাইয়ের পাত্রটি তাদের মাথার উপর ঘুরিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেন। অতপর শবকে গৃহ থেকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য নির্মিত সুদৃশ্য বাহন যা ‘প্রাসাইদ্’ নামে পরিচিত তাতে তুলে শ্মশানের উদ্দেশ্যে যাওয়া হয়।
শ্মশানে শবকে পোড়ানোর জন্য একটি লাকড়ির স্তুপ তৈরি করা হয়। এর নাম রুবাকুর। রুবাকুর তৈরির জন্যও সুনির্দিষ্ট নিয়ম মানতে হয়। এতে থাকে ছয়টি খুঁটি। সাধারণত পূর্বশির বা উত্তরশির করে রুবাকুর তৈরি করা হয়। এটি হয় প্রায় ৫ থেকে সাড়ে ৫ ফুট উঁচু। পুরুষের জন্য পাঁচ স্তরবিশিষ্ট ও নারীর জন্য সাত স্তরবিশিষ্ট রুবাকুর তৈরি করতে হয়। রুবাকুরের জন্য আনীত কোনো লাকড়ি ভবিষ্যতের জন্য রাখা বা অন্যত্র ফেলে রাখা বিধিসম্মত নয়। এতে অকল্যাণ হয় বলে দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে।

রুবাকুর বা চিতা


রুবাকুরকে ঘিরে লম্বা চারটি তাজা বাঁশ পুঁতে রাখা হয় যা চান্দাল বাইত্ নামে পরিচিত। এসব বাঁশের মাথায় একটি সাদা কাপড় বেঁধে দেওয়া হয়। এটি ‘চান্দাল কানি’ নামে পরিচিত। রুবাকুর থেকে সামান্য দূরে কারুকাজ খচিত দুটি সাদা কাপড় টাঙিয়ে দেয়া হয়। এগুলোর নাম ‘থাংগোইন্’।
শ্মশানে পৌঁছার পর ঊর্ধ্বদিক বা উত্তর বা পূর্ব দিক হতে প্রাসাইদটির পদপ্রান্ত মহিলার ক্ষেত্রে সাতবার এবং পুরুষের ক্ষেত্রে পাঁচবার রুবাকুর-এ স্পর্শ করিয়ে তা রুবাকুরে তুলে দেয়া হয়। শবকে রুবাকুরে তুলে দেয়ার পর আবারও তার জন্য আনীত ভাতের মোচা খুলে অল্প মুখে গুঁজে দেয়ার পর চোঙায় করে আনা জলও অল্প মুখে গুঁজে গিয়ে বাকিটা ফেলে দেওয়া হয়। অতপর স্ত্রী-পুত্র-কন্যা থাকলে রুবাকুরের চারপাশে সাত পাক ঘুরে তাতে অগ্নিসংযোগ করেন। সেই সাথে আগত অন্যান্য লোকজনও রুবাকুরে অগ্নি সংযোগ করে থাকেন।

শবদাহের পর শ্মশানের পাশে সুবিধাজনক স্থানে আগত অতিথিদের নিয়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মাধ্যমে পুনরায় পঞ্চশীল গ্রহণ, সূত্র শ্রবণ, অনিত্যসূত্র পাঠ ও সদ্ধর্মদেশনার আয়োজন করা হয়। এ ধরনের ধর্মীয় আয়োজন অবশ্য সব স্থানে করা হয় না।

(গ) গঙ্গায় অস্থি ও ভস্ম বিসর্জন:
শবদাহের পরের দিন সকালে মৃতের স্বামী, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা ও নিকট আত্মীয়েরা শ্মশানে গমন করেন। প্রথমে ভস্মের উপর চন্দনের পবিত্র জল ছিটানো হয়। অতপর একটি মাটির কলস নিয়ে পাশর্^বর্তী জলাধার হতে জল এনে চিতার উপর মাথা থেকে পা পর্যন্ত জল ঢালতে হয়। একটি ছোট ঝুড়িতে অল্প অল্প চিতাভস্ম নিয়ে প্রতিজন তিনবার করে তা জলে ফেলে দেয়। এসব ক্রিয়াকর্ম মৃত ব্যক্তির পুত্রগণ ক্রমান্বয়ে জ্যেষ্ঠ থেকে কণিষ্ঠ পর্যন্ত একে একে সবাই করেন। পুত্রের অভাবে আপন চাচাত ও জ্যেঠাত ভাইয়েরাও এই কাজটি করতে পারেন।

শবদাহের পর শ্বাশানের পাশে সূত্র


অতপর রুবাকুর নির্মানের সময় ব্যবহৃত খুঁটিগুলো মাটি থেকে তুলে ফেলা হয়। ভস্ম হতে ‘মুঅ তাঙা’ গুলো সংগ্রহ করা হয়। যে বা যারা এসব কড়ি পায়, তাদেরকে ভাগ্যবান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তখন পুড়ে যাওয়া হাঁড়ের বিভিন্ন অংশ যেমন মাথার খুলি, বুকের হাঁড়, পায়ের হাঁড়, হাতের হাঁড় প্রভৃতি হতে একটি ছোট মাটির পাত্রে অল্প অল্প নিয়ে তাতে সাদা কাপড় দিয়ে পাত্রের মুখ বেঁধে ফেলা হয়। উক্ত মাটির পাত্রকে বলা হয় ‘তবা’। চিতার উপর বাঁশের কাঠি দিয়ে ঘেরা দিয়ে একটি ঘর বা ঘরের আকৃতি তৈরি করা হয়। এতে তাজা কলাপাতা বিছিয়ে তাতে মুড়ি-মুড়কি, বিভিন্ন খাবার, মোমবাতি, আগরবাতি, শস্যের বীজ, নিত্য ব্যবহার্য জিনিস যেমন দাবা, দা, ঝুড়ি, বাসন, অর্থকড়ি প্রভৃতি দেয়া হয়। অতপর তার চারপাশে মোমাবাতি জ্বালিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা হয় এবং ভবিষ্যতে পারিবারিক উন্নতির জন্য প্রার্থনা করা হয়।
ফেরার পথে অস্থি ও ভস্মে ভরা ‘তবা’ নামক মাটির পাত্রটি নিয়ে মৃতব্যক্তির জ্যেষ্ঠপুত্র বা পুত্রের অভাবে জ্যেঠাত বা চাচাত ভাই কোমর সমান জলে নেমে, জলে ডুব দিয়ে উক্ত পাত্রটি ভাটির দিকে ছুঁড়ে মারবেন। তার আর পিছনে ফিরে তাকানোর নিয়ম নেই। ‘তবা’ বিসর্জনকারীর ডান হাতের কণিষ্ঠাঙ্গুলে একটি সাদা সুতা বাঁধা থাকে। তা নদীর পাড় হতে একজন মুরুব্বী ধরে রাখেন। অস্থি-ভস্ম বিসর্জন শেষ হলে তিনি সেই সুতায় টান দিলে অস্থি-ভস্ম বিসর্জনকারী ব্যক্তি জল থেকে উঠে আসেন। অস্থি-ভস্ম বিসর্জনের সময়ে পরিধানকৃত সকল বস্ত্র সেখানে খুলে ফেলে দিতে হয়। সে কারণে অনেকে কেবল গামছা পরে এসব কাজ করেন। এভাবে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে অস্থি-ভস্ম বিসর্জনের নাম ‘হার ভাসানা’।
যোগেশ বাবু বলেন, ‘অবস্থাপন্ন পরিবারের বৃদ্ধ-বৃদ্ধার মৃত্যু হলে দাহ করার পূর্বে সাদেংগ্রী রাজার অনুকরণে গাড়ী টানার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। তবে উহার কোন বাধ্য-বাধকতা নেই। সাদেংগ্রী রাজা শাক্যবংশীয় নরপতিগণের মধ্যে সকল বিষয়ে শ্রেষ্ঠ ও প্রাতঃস্মরণীয় বলে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে প্রসিদ্ধ [তথ্যসূত্র: তঞ্চঙ্গ্যা উপজাতি (১৯৮৫), পৃ. ২৬]।’ গাড়ি টানার জন্য সাধারণত ভাইজ্যা বাঁশের বেত তৈরি করা হয়। এসব বেত একসাথে পেঁচিয়ে প্রায় দুই ইঞ্চি মোটা দড়ি তৈরি করা হয়। এসব তৈরি করতে করতে হয় পথের ধারে অথবা গাঙের পাড়ে। গ্রামের ভিতরে বা বসতভিটায় বসে এসব দড়ি তৈরি করা রীতি বিরুদ্ধ।

(ঘ) সাদ্দিন্যা অনুষ্ঠান বা সাপ্তাহিক ক্রিয়া:
মৃতদেহ সৎকারের পর হতে সাত দিনের মধ্যে মৃতব্যক্তির উদ্দেশ্যে ভিক্ষুসংঘকে আমন্ত্রণ করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রথা রয়েছে। এই অনুষ্ঠানের নাম ‘সাদ্দিন্যা’। বর্তমানে বাংলা ভাষায় তা ‘সাপ্তাহিক ক্রিয়া’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। সাপ্তাহিক ক্রিয়ার জন্য বেশ কিছু ক্রিয়াকলাপ রয়েছে। যেমন-
১। চেরাগ ঘর : সুবিধাজনক স্থানে নির্মাণ করতে হয় ভিক্ষুসংঘের জন্য ৫x৫ হাত বিশিষ্ট একটি অস্থায়ী ঘর। এটি ‘চেরাগ ঘর নামে পরিচিত। এটি হতে হবে মৃতের বাড়ি হতে অদূরে। এখানে বসে ধর্মীয় কার্যাদি সম্পাদন করা হয়। এই চেরাগ ঘরের এক প্রান্তে থাকবে বুদ্ধের আসন। একপাশে থাকবে জলভর্তি দুটি মাটির কলস। ঘরের চার কোণায় বেঁধে রাখা হয় ডাব, আঁক, কলা প্রভৃতি। চেরাগ ঘরটি অবশ্য বাঁশ-গাছ দিয়ে তৈরি এবং মাটি থেকে উঁচু বা মাচাংঘর হতে হবে। চেরাগ ঘরের সামনে একটি খোলা বারান্দাসমৃশ মাচাং থাকতে হয়।

২। থামাংটং ঘর : চেরাগ ঘরের পাশে বাঁশ দিয়ে প্রায় চার ফুট উঁচু আরেকটি ২x৩ হাত বিশিষ্ট আয়তাকার মাচাংঘর তৈরি করা হয়। এর নাম থামাংটং ঘর। সাপ্তাহিক ক্রিয়ার দিন ভোরে যুবক-যুবতীরা এখানে ভাত, মাংস, নারকেল, বিভিন্ন খাদ্যভোজ্য দিয়ে মোচক আকৃতির ছোট ছোট ভাতের পাহাড় তৈরি করে বসিয়ে দেয়। মাচাঙের চারপাশে পাঁচটি মাটির তৈরি জলপাত্র স্থাপন করে। অতপর দেবলোক, প্রেতলোক সকলকে আহ্বান করে এসব খাবার গ্রহণের জন্য। এছাড়াও থামাংটং ঘরের পাশে মাটি হতে প্রায় এক বিগত উঁচু আরও তিনটি ঘর নির্মাণ করা হয়। এসব ঘরে সাধারণত শ্মশান রক্ষাকারী দেবতা বা মিচ্ছাহলা ও তার সাঙ্গপাঙ্গ এবং মৃত ব্যক্তির প্রেতাত্মাকে আহ্বান করে পূজা করা হয়। থামাংটং ঘরে আরও টাঙানো হয় বিভিন্ন রঙের সুতা দিয়ে তৈরি বিশেষ আকৃতির দুটি ছোট তাঁত।

৩। থাংগোইন্ : প্রায় ৬ ফুট লম্বা সাদা কাপড় দিয়ে বিশেষ কারুকাজ খচিত চারটি থাংগোইন তৈরি করা হয়। এর মধ্যে দুটি বাঁশ দিয়ে টাঙানো হয় চেরাগ ঘরের দু’পাশে এবং বাকি দুটি টাঙানো হয় থামাংটং ঘরের দু’পাশে।

থামাংটং ঘর

৪। ধর্মীয় অনুষ্ঠান : উক্ত দিন ভিক্ষুসংঘের উদ্দেশ্যে সাধ্যমতো সংঘদান, অষ্টপরিষ্কার দান, চীবর দান, বুদ্ধমুর্তি দান, প্রব্রজ্জ্যা দান প্রভৃতি অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়। পরলোকগত জ্ঞাতিদের উদ্দেশ্যে পুণ্যদান করা হয়। পুণ্যানুষ্ঠান শেষে আগত অতিথিদেরকে মধ্যাহ্ন ভোজনও করানো হয়। বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির মৃত্যুর ক্ষেত্রে একজোড়া ফানুসও উত্তোলন করা হয়ে থাকে।

(ঙ) ভাত্দ্যা
বহুকাল আগে পরলোক সকল আত্মীয়-স্বজনদের উদ্দেশ্যে সম্মিলিতভাবে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করার প্রথা তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে প্রচলিত আছে। এর নাম ‘ভাত্দ্যা’। সাধারণত বিগত পাঁচপুরুষ পর্যন্ত পরলোকগত জ্ঞাতীদেরকে পুণ্যদানের জন্য এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। যাঁদের উদ্দেশ্যে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, তাদের নাম পূর্ব হতে তালিকাভুক্ত করতে হয়। যাতে কেউ বাদ না যায়। তালিকাভুক্ত সকলের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থানে কৃত্রিম শ্মশান তৈরি করা হয়। তাতে একটি করে আদারা (ভাতের থালা) প্রস্তুত করে মৃত ব্যক্তিদেরকে আহŸান করা হতো। এসব কাজ বৈদ্যের দ্বারা করা হয়ে থাকে।
শোনা যায়, তখন মৃতদের তালিকা দৃষ্টে পরলোকগত পূর্ব পুরুষগণকে নাম ধরে ডাকা হলে অনেকে মূর্ছিত হয়ে পড়তো। মূর্ছিত ব্যক্তি যে পরিচয়ে সংজ্ঞালাভ হতো, তাকে তথাকথিত মৃত ব্যক্তির পুনর্জন্ম হয়েছে বলে ধারণা করা হতো এবং গোষ্ঠির আত্মীয়রা তার আকাঙ্খা পূরণে তৎপর হতো। এভাবে অনেকের সংজ্ঞালাভ করতে অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে যেতো। আবার কোন কোন স্থলে রাত্রি পার হতো। সেসময়ে নিয়োজিত বৈদ্যেরা আগরতারা পাঠ করতো।
পরের দিন বিশেষভাবে তৈরি মঞ্চের উপর উপবেশ করে অসা-বৈদ্যরা আগরতারা ও মন্ত্রাদি পাঠ করতো। প্রত্যেক প্রেতাত্মার উদ্দেশ্যে যেসব স্বতন্ত্র আদারার ব্যবস্থা করা হতো অসাগণ ওই সময়ে সমস্বরে তাতে মন্ত্র পাঠ করতো। এই সময়ে কোনো কীট-পতঙ্গাদি আদারায় পতিত হলে মনে করা হতো যে, ওই সব ব্যক্তি তীর্যক যোনি প্রাপ্ত হয়েছে। ওই সময়ে জ্ঞাতিদের মধ্যে কেহ কেহ হয়তো সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়তো। তখন আবার মৃতদের তালিকাভুক্ত লোকদের নামোল্লেখ করে ‘তুমি আমার অমুক হলে, এই পিÐ গ্রহণ কর’ এভাবে প্রত্যেক আদারা যাচাই করতে করতে হঠাৎ মূর্ছিত ব্যক্তির সংজ্ঞালাভ হতো। তাতে সে নামোল্লেখিত জ্ঞাতীর পুনর্জন্ম হয়েছে বলে ধরে নেয়া হতো। তখন মৃত আত্মার উদ্দেশ্যে প্রণাম করে ‘তুমি আমার পিতামহ অথবা অমুক ছিলে, এখন অমুক হয়েছে’ ইত্যাদি বলে এবং বিবিধ দ্রব্য প্রদান করে তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা চলতো। তথ্যসূত্র: তঞ্চঙ্গ্যা উপজাতি : যোগেশ চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা (১৯৮৫), পৃ. ২৬-২৭।
‘তঞ্চঙ্গ্যা উপজাতি’ গ্রন্থের লেখক প্রয়াত যোগেশ চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা ‘ভাত্দ্যা’ অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ পাননি বলে আক্ষেপ করেছিলেন। তবে আমি ছোটবেলায় আমাদের গ্রামে এ ধরনের একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের স্মৃতিকথা এখনো মনে আছে।
অনুষ্ঠানের দিন তালিকাভুক্ত সকলকে নাম ধরে আহ্বান করে পুণ্যদান গ্রহনের জন্য আহ্বান করা হয়ে থাকে। এর ফলে তাঁরা যাতে সুগতি লাভ করেন এবং আয়োজককে আশীর্বাদ ও পারিবারিক সুখ-শান্তি ও উন্নতিতে সহায় হন তা প্রার্থনা করা হয়ে থাকে।

(চ) মৃত সৎকারে কিছু বিধি-নিষেধ
সকল শবদেহকে পোড়ানোর নিয়ম তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে নেই। আবার দিন বা রাত্রির যেকোনো সময়ে শবদেহ পোড়ানোর নিয়মও নেই। তাছাড়াও আরও অনেক নিয়ম প্রাচীন তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে প্রতিপালন করা হতো। সেসব নিয়ম-কানুন এখানে তুলে ধরা হলো।
১. পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর শবদেহকে পোড়ানো নিষেধ। তাকে কবরে দাফন করতে হয়। দিন বা রাতের যেকোনো সময়ে শবদেহ কবরে দাফন করা যায়। তবে খেয়াল রাখতে হবে, দুধের শিশুর মৃত্যু হলে খালের ওপারে শবকে কবরস্থ করা অনুচিত অর্থাৎ মৃত শিশুর পরিবার ও কবরের মাঝে কোনো খাল বা নদী থাকা অনুচিত।
২. মহামারী, কলেরা, ডায়রিয়া, প্লেগ প্রভৃতির কারণে মৃত ব্যক্তির শবদেহকে আগুনে পোড়ানোর নিয়ম নেই। এ ধরনের শবকে শ্মশানে কবরস্থ করতে হয়।
৩. গ্রামের বাইরে কোনো অসুখ বা দুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তির শবদেহ গ্রামে ও ঘরের ভেতরে প্রবেশ করানো নিষেধ। এ ধরনের শবদেহ সরাসরি শ্মশান বা ক্যাঙের পাশে সাময়িককালের জন্য রাখতে হয়। অতপর বিধি-মোতাবেক কবর দেওয়া বা পোড়ানো হয়।
৪. শবদেহ পোড়ানো বা কবরস্থ করার সময় উত্তরশির বা পূর্বশির করে শবদেহকে শোয়ানো হয়ে থাকে। এ কারণে কবর বা চিতা উক্ত প্রথা মাথায় রেখে তৈরি করতে হয়। আবার খালের ভাটির দিককে নি¤œদিকে হিসেব করেও চিতা তৈরি করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ভাটির দিকে পা ও বিপরীত দিকে মাথা রেখে শবদেহকে শোয়ানো হয়ে থাকে।
৫. শবদেহ পোড়ানোর জন্য তৈরিকৃত লাকড়ির স্তুপ বা ‘রুবাকুর’ পুরুষের জন্য পাঁচ স্তর এবং নারীর জন্য সাত স্তর বিশিষ্ট হতে হয়।
৬. শবদেহ পোড়ানোর পরের দিন যেহেতু জলে অস্থি বিসর্জনের প্রথা তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে প্রচলিত আছে, সেহেতু শ্মশান সবসময় জলাধারের পাশে হতে হয়। জলাধারে অস্থিভস্মের পাত্র ভাসানো মতো জল থাকা বাঞ্ছনীয়।
৭. যেকোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর অবশ্যই ‘সাদ্দিন্যা’ বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করতে হয়। তা না হলে পরকালে মৃত ব্যক্তির বিভিন্ন অন্তরায় হয় এবং পরিবারের বিভিন্ন উপদ্রব ও দুর্ঘটনা ঘটে বলে প্রবীন তঞ্চঙ্গ্যাগণ বিশ্বাস করতেন।
৮. রাত বারোটা থেকে দুপুর বারোটার মধ্যে শবদেহকে স্নান করানো ও ‘বিয়াঘরে’ তোলার নিয়ম নেই।
৯. দুপুর বারোটার পর থেকে সূর্য ডোবার পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে চিতায় অগ্নি সংযোগ করার প্রথা প্রচলিত রয়েছে।
১০. যেদিন শবদাহ করা হবে, কেবল সেদিন সকালে রুবাকুর বা শবদেহ পোড়ানোর জন্য লাকড়ির স্তুপ বা চিতা তৈরি করতে হয়। এর আগে লাকড়ির ব্যবস্থা করা বা রুবাকুর তৈরি করা নিষেধ। যদি ভুলক্রমে দাহ করার একদিন আগে চিতা তৈরি হয়ে থাকে কিংবা বিভিন্ন জটিলতার কারণে উক্ত দিবসে শবদেহ পোড়ানো সম্ভব না হয়, তাহলে সন্ধ্যার আগেই অবশ্যই সেই চিতা ভেঙ্গে ফেলতে হয়। নতুন উক্ত পরিবার ও এলাকার জন্য ঘোরতর অশুভ হিসেবে বিবেচিত হয়।
১১. তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে বুধবারকে বলা হয় ‘পঁচাবার’। এ কারণে বুধবারে মৃত সৎকার করা নিষেধ।
১২. যে বারে (যেমন- শনিবার, রবিবার প্রভৃতি) পরলোকগত ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেছে, সেই বারে তার দাহকার্য সম্পাদন করা নিষেধ।
১৩. এছাড়াও ঘোর অমাবস্যায় মৃত সৎকার করা হয় না।

পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আধুনিক তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে এসব নিয়ম-কানুন তেমন অনুসরণ করা হয় না। এতে প্রবীন তঞ্চঙ্গ্যাদের ক্ষোভ ও অভিযোগের শেষ নেই। অনেক সময় তাঁরা বলে থাকেন, ‘এজন্য বর্তমান সময়ে মানুষ বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনা বা বিপদ-আপদ ও উপদ্রবের সম্মুখীন হচ্ছে।’
পরিশেষে বলতে হয়, অন্য জাতির সামাজিক সংস্কারের সাথে তুলনা করে স্বজাতির এসব প্রাচীন সংস্কারসমূহকে কুসংস্কার মনে হতে পারে, কিন্তু এটাই একটি জাতির স্বকীয়তা। এটাই স্বতন্ত্র জাতির হিসেবে আমাদের বৈচিত্র্য। আমাদের উচিত প্রচলিত প্রাচীন সংস্কারসমূহ যথাসাধ্য প্রতিপালনের চেষ্টা করা। এতে তঞ্চঙ্গ্যা জাতির স্বাতন্ত্র্যতা ও বৈচিত্র্য রক্ষিত হবে এবং বিশে^র বুকে তঞ্চঙ্গ্যা জাতির বৈচিত্র্য উপস্থাপন করা সহজ হবে।

লেখক পরিচিতি:
পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম স্বনামধন্য কবি ও সাহিত্যিক, ওয়াগ্‌গা কাপ্তাই, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা।

Toingang
Toingang
Articles: 65

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *