সমাজ সংস্কারে ও মানবাধিকারে রাজগুরু ভদন্ত অগ্রবংশ মহাস্থবির

শিশির বড়ুয়া

ভগবান বুদ্ধের সময় থেকে বুদ্ধ বাণী প্রচার প্রসারে ভিক্ষু সংঘ অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কেননা, সম্যক সম্বুদ্ধ ভিক্ষু সংঘকে বহুজন সুখে, বহুজন হিতে, দেব-মানুষের আদি, মধ্য ও অন্ত কল্যানে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি এক এক ভিক্ষুকে এক এক দিকে যাত্রার নির্দেশ দেন। বলেছিলেন, ঘটনা চক্রে যদি দু’জন ভিক্ষু একস্থানে মিলিত হয়, তবে তারা দু’জন যেন দু’দিকে যায়। বুদ্ধ নির্দেশ পালনে ভিক্ষু সংঘ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্যেরে করে ধ্রুবতারা, মৃত্যুকে শংকা না করে পাড়ি দিয়েছিলেন মরুসাগর, অতিক্রম করেছিলেন পর্বত কন্দর, অশোক, কনিষ্ক পাল রাজাদের রাজত্বকালে ভিক্ষু সংঘের ত্যাগ তিতিক্ষার ইতিহাস আজ কথা বলছে। তাই দেখা যায় খাইবার থেকে টেকনাফ, গান্ধার থেকে জলধি শেষ এবং ভোল্ল্গা থেকে গঙ্গা পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্মের প্লাবনে প্লাবিত হয়েছিল এর বিপরীত দিকও আছে। মানে উল্টো রথ যাত্রা। সম্রাট অশোক ও কনিষ্কের পরে উত্তর ভারত বৌদ্ধ শূন্য হয়ে যায়। পাল রাজত্বে বাংলায় হলো বৌদ্ধ ধর্মের ঠিকানা। পাল রাজত্ব শেষে বৌদ্ধ ধর্মের ওই ঠিকানাকে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পড়তে হত।

উনিশ শতকীয় নব জাগৃতির উষ্ণ স্পর্শে কতিপয় ভিক্ষু ও গৃহীর দ্বারা বৃহত্তর চট্টগ্রাম থেকে বৌদ্ধ ধর্মের ক্ষীণালোকের প্রদীপ আবার প্রোজ্জ্বল হতে থাকে। প্রদীপের কাছে আলো স্পষ্ট ও উজ্জ্বল থাকে, ঈষৎ দূরে সেই আলো কাক জোছনার মত হয়। আলো-আঁধারের লুকোচুরি চলে। বলা যায় কুঞ্জছায়া।

বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম কুঞ্জছায়াবৃত। ওখানে একসময় ত্রিপুরা জাতি সত্ত্বা ব্যতিত, মারমা, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, চাক, খেয়াং, খুমি, ম্রো, বম, পাংখো প্রভৃতি জনগোষ্ঠী ছিল বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী, সমান্তরাল ভাবে প্রকৃতি পূজারীও। বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে। বিহার সংখ্যা ছিল কম এবং ভিক্ষুদের অধিকাংশই ছিলেন মারমা। চাকমা সার্কেলে কেয়াং এ চাকমা বা তঞ্চঙ্গ্যা ভিক্ষু ছিলেন। বিহারের সংখ্যা ছিল নগন্য, মিথ্যে দৃষ্টিতে ছেয়ে গিয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম। সমতলীয় বৌদ্ধদের মত চাকমারা লক্ষী, সরস্বতী, মনসা পূজা, কার্তিকের ব্রত ইত্যাদি পালন করত। তীর্থ স্থান বলতে তারা বুঝত সীতাকুণ্ডু ও মন্দাকিনী। তারা ধর্মীয় ও সামাজিক ব্রতাদি করত ব্রাহ্মনকে দিয়ে। জনশ্রুতি যে তারা বৌদ্ধ ভিক্ষু দেখলে পরিহাস করত তারা বৌদ্ধ ভিক্ষুকে নাচতে বাধ্য করত। এমতাবস্থায় অগ্রবংশ মহাস্থবির এগিয়ে এলেন ধর্ম ও বিনয় রক্ষার্থে। জন্ম: অগ্রবংশ মহাস্থবিরের গৃহী নাম ছিল ফুল নাথ তঞ্চঙ্গ্যা। তিনি ২৩ নভেম্বর ১৯১৩ সনে জন্ম গ্রহণ করেন। জন্ম তার বিলাই ছড়ি থানাধীন রাইখ্যং নদীর পশ্চিম তীরে ১২২ নং কুতুবদিযা মৌজায়। পিতার নাম রুদ্রসিং মহাজন, মায়ের নাম ইচ্ছাবতী তঞ্চঙ্গ্যা।

বাল্যাবস্থা: বাল্যে তিনি ছিলেন উদার ও সুন্দর চেহারার অধিকারী, কণ্ঠস্বর ছিল মিষ্টি মধুর। যাত্রা দলে গান গেয়ে তিনি প্রশংসিত হয়েছিলেন। তবু তিনি অনুভব করতেন কে যেন তাকে দ্রুত বেগে টানছে। কিসের এক অচিন্ত্য আকর্ষণ।

প্রব্রজ্জিত জীবন: ফুলনাথ তঞ্চঙ্গ্যা ১৯৩৫ সালে শ্রীমৎ তিসস মহাস্থবিরের নিকট শ্রামণ্য দীক্ষা লাভ করেন। তার কাছেই ১৯৩৯ সালে উপসম্পদা লাভ করেন, তখন তার নাম হয় অগ্রবংশ ভিক্ষু। তিনি প্রবেশিকা পাশ করেন ১৯৪৭ সালে। পরে তিনি আঁধার মানিক বিহারের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ আনন্দ মিত্র মহাস্থবিরের উপদেশে অরণ্যচারী হন। এরপর ধর্মীয় শিক্ষা লাভের জন্য ১৯৪৮ সালে ইয়াংগুন গমন করেন। সেখানে দর্শন শাস্ত্রে বিশেষ ব্যুৎপত্তি লাভ ও এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। ভদন্ত অগ্রবংশ ভিক্ষু ১৯৪৫-৫৬ সাল স্থায়ী ইয়াংগুনের ৬ষ্ঠ বৌদ্ধ মহা সংগীতিতে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন সংগীতিকারক। শৈশবে তার শিক্ষক ছিলেন ইন্দ্রমনি। উপসম্পনা জীবনে উপাধিক পরীক্ষা পাশ করেন ভদন্ত ধমানন্দের তত্ত্বাবধানে। ইয়াংগুনের পরে তিনি পিকিং (বেইজিং) সফর করেন। এদিকে রাজা ত্রিদিব রায় তাঁকে আমন্ত্রন করেন। ১৯৫৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর ভদন্ত অগ্রবংশ স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলে এক শুভ দিনে তাকে হস্তী পৃষ্ঠে আরোহন করায়ে রাজকীয় মর্যাদায় তাঁকে রাজগুরু পদে বরণ করা হয়। তঞ্চঙ্গ্যা ভিক্ষুকে চাকমা রাজগুরু পদে অভিষিক্ত করাতে তঞ্চঙ্গ্যাদের গৌরব বৃদ্ধি পায়।

মহাস্থবির বরণ: অগ্রবংশ মহাস্থবিরকে ২৬ মার্চ ১৩৭১ বাংলা সালে মহাস্থবির বরণ উপলক্ষে চাকা ও বড়ুয়া সমন্বয়ে ১৬ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। চাকমা, মং ও বোমাং রাজা ত্রয়কে প্রধান পৃষ্ঠ পোষক করে ১০ সদস্য বিশিষ্ট একটি পৃষ্ঠপোষক কমিটি গঠিত হয়। মহাস্থবির বরণ উপলক্ষে সলিল রায় লিখিত “বুদ্ধের স্মরণে জাগি” নাটকে রাজকুমারী সহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মঞ্চস্থ নাটকটি উপভোগ্য হয়েছিল। উক্ত অনুষ্ঠানে নেপাল ও মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন। ভদন্ত অগ্রবংশের অবদান কবি গুরুর উচ্চারণ, “মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়, আড়ালে তার সুর্য হাসে।” চাকমা সার্কেলে ইতোপূর্বে বৌদ্ধ ধর্ম মেঘাচ্ছন্ন ছিল। ভদন্ত অগ্রবংশ যেন মেঘের আড়ালে থেকে সূর্যের মত পার্বত্যকালে উদিত হলেন। চাক, খিয়াংও ত্রিপুরাদের মধ্যে কয়েকজন অগ্রবংশের শিষ্যত্ব গ্রহন করল। মুরং সম্প্রদায়ের হৃদয় রঞ্জন রোয়াজা স্থাপন করলেন বিহার, পার্বত্য চট্টগ্রামে দানশীল ভাবনা বুদ্ধপূজা, সীবলী পূজা, সংঘদান, অষ্ট পরিষ্কার দান, কঠিন চীবর দান প্রভৃতি বৌদ্ধিক আদর্শে মানুষ উদ্দীপিত হয়ে উঠল। ভদন্ত অগ্রবংশ স্থাপন করলেন ভিক্ষু সমিতি, বৌদ্ধ সমিতি ও পালি টোল।

পরিব্রাজন: শ্রীমৎ অগ্রবংশ ১৯৭৩ সালে ভারত সরকারের আমন্ত্রনে তিন দিন ব্যাপী নিখিল ভারত বৌদ্ধ মহা সম্মেলনে যোগ দানের জন্য ভুবনেশ্বর গমন করেন। সম্মেলনের শেষের দিন তিনি সভাপতিত্ব করেন। ১৯৮৭ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি নেপালে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সম্মেলনে যোগদান করেন। তা’ছাড়া তিনি থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লন্ডন, হল্যান্ড, জার্মান, সুইজারল্যান্ড, জাপান ও ভিয়েতনাম ভ্রমন করেন। তিনিই পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র বৌদ্ধ ভিক্ষু যিনি ৬ষ্ঠ সংগীতিতে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। তাঁর সাথে শ্রীলংকার সাবেক প্রধান মন্ত্রী, যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক মন্ত্রনালয়, ডব্লিউ এফ বি এর সম্মানিত জেনারেল সেক্রেটারী এবং জার্মানীর এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সাথে পত্রালাপ ছিল।

সাহিত্য চর্চা: রাজগুরু শ্রীমৎ অগ্রবংশ মহাস্থবির পার্বত্য চট্টগ্রামে কেবল মাত্র বৌদ্ধিক জাগরণ ও ভ্রমণে ব্যাপৃত ছিলেন না। তিনি জাগরণকে ত্বরান্বিত করার জন্য সাহিত্য চর্চাও করেছেন। তিনি বুদ্ধোপসনা, বোধিচর্যা দর্শন ও বিদর্শন শ্রামনের কর্তব্য, মানব ধর্ম পঞ্চশীল পরিনাম (নাটক মহাযাত্রা বিজ্ঞান ও বৌদ্ধধর্ম এবং স্টপ জেনো সাইড ইন সি এইচ টি বাংলাদেশ নামক গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি চাকমা ভাষায় চাংমা কধারা মংগল সূত্র রচনা করেন। এবারে শ্রীমৎ অগ্রবংশ মহাস্থবির লিখিত ইংরেজি বইটি সম্পর্কে কিছু উল্লেখের প্রয়োজন বোধ করি।

মানবাধিকারে ভদন্ত অগ্রবংশ: বিংশ শতকের আশির দশকে পাহাড়ীদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদে ভদন্ত অগ্রবংশ কলকাতা গিয়ে এক জন সভার আয়োজন করেন এবং ভারতের সেই সময়কার প্রধান মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। ১৯৮৭সালে তিনি নেপালে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি এবং আদিবাসী জনগণের উপর অমানুষিক নিপীড়ন-নির্যাতন এবং মানবাধিকার লংঘনের বর্ণনা বিশ্বের জনগণের নিকট তুলে ধরেন। তিনি পার্বত্য পরিস্থিতি তুলে ধরতে জেনেভা ও গিয়েছিলেন, লিখেন স্টপ জেনোসাইড ইন সি এইচ, বাংলাদেশ। এতেই প্রতীয়মান হয় যে, শ্রীমৎ অগ্রবংশ মহাস্থবির মাধবাধিকারের প্রতি অবিচল সম্মান এবং মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ।

উপসংহার: জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা ধরার ধুলায় যতই তার হোক অবহেলা। ভদন্ত অগ্রবংশ একজন তঞ্চঙ্গ্যা। তারা উপেক্ষিত কিন্তু উল্লিখিত পংক্তিটি ভদন্তের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তিনি অগ্র মহাপন্ডিত ও অগ্র মহাসদ্ধম্ম জ্যোতিকাধ্বজ উপাধি লাভ করেন এবং মহাসংঘ নায়ক পদে অলংকৃত হন।

লেখক* বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও বৌদ্ধ ধর্মীয় লেখক

Toingang
Toingang
Articles: 72

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *