কর্মধন তঞ্চঙ্গ্যা*
ভূমিকা:
ছোট বেলা থেকেই তঞ্চঙ্গ্যা গল্প (পৌরাণিক গল্প), কিচ্ছা (ধাঁধা) শুনে শুনে বড় হয়েছি। শুধু আমি নয় আমার মতো আরও অনেকেই এভাবে বড় হয়েছেন। দাদু, দাদি থেকে শুরু করে বাবা-মা, বড় দিদি, বড় দাদা, নানী সকলে ছিলেন আমার গল্পের কথক। বিশেষ করে যখন রাতে শুয়ে পড়তাম কিন্তু চোখে ঘুম আসতো না তখন গল্প শোনার আবদারটা প্রবল হতো। কী গল্প থাকতো না! রাজা-রানী, রাজপুত্র-রাজকন্যা, ভূত, রাক্ষসপুরী, পক্ষীরাজ ঘোড়া সব গল্প থাকতো সেখানে। তবে সবচেয়ে বেশি শুনতে চাইতাম আমাদের তঞ্চঙ্গ্যাদের নিজস্ব পৌরাণিক বা পুরানো দিনের গল্পগুলো। কারণ এসব গল্পে ঝুম পাহাড়ের গন্ধ, সংস্কৃতি এবং আলো বাতাস থাকতো।
প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকে পড়ার সময় গোপাল ভাঁড়, বীরবল, মোল্লা নাসির উদ্দিন হোজ্জা, ঈশপের গল্পের সাথে আমার পরিচয় হয়। এর মধ্যে গোপাল ভাঁড় এবং ঈশপের গল্পগুলো আমাকে বেশি আকৃষ্ট করতো। বিশেষ করে গোপাল ভাঁড়ের চৌকস বুদ্ধিমত্তা ও পাণ্ডিত্য আর ঈশপের চরিত্রগুলো পশু-পাখি হওয়ার পরও তারা কথা বলতো বিষয়টি আমাকে আরও বেশি আকর্ষণ করেছিল। গোপাল ভাঁড়, বীরবল, মোল্লা নাসির উদ্দিন এবং ঈশপের প্রায় সব গল্পগুলো আমার মুখস্থ ছিল। পরবর্তীতে চাণক্য, আলাওল এর সাথে পরিচয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোতে চাণক্য খুবই প্রাসঙ্গিক একটি চরিত্র। আলাওল আরাকান রাজ সভার সভা কবি ছিলেন। অন্যদিকে মোল্লা নাসির উদ্দিন হোজ্জা ছিলেন মধ্যযুগীয় একজন সুফি সাধক। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল রম্য, হাস্যরসাত্মক এক চরিত্র হিসেবে। তিনি হাস্য, রম্য ও মনোরঞ্জন দিয়ে রাজদরবার, রাজসভাকে মাতিয়ে রাখতেন। সাথে নানা পরামর্শ দিয়ে রাজা, তার পরিবার এবং রাজ্যকে বিভিন্ন বিপদ থেকে উদ্ধার করতেন।
গোপাল ভাঁড়, বীরবল, আলাওল এবং চাণক্য এরকম কিছু ব্যক্তির নাম আমরা জানি যারা নিজেদের জ্ঞান, বুদ্ধি, পাণ্ডিত্যের মাধ্যমে রাজ্য, রাজা এবং রাজপরিবারকে সহযত্নে আঁকড়ে রাখতেন।
‘গোপাল ভাঁড়’ অষ্টাদশ শতাব্দীর নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় একজন জ্ঞানী, পণ্ডিত এবং বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল একজন হাস্য, রম্য ও মনোরঞ্জনকারী হিসেবে। তিনি হাস্য, রম্য ও মনোরঞ্জন দিয়ে রাজদরবার, রাজসভাকে মাতিয়ে রাখতেন। সাথে নানা পরামর্শ দিয়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, তার পরিবার এবং রাজ্যকে বিভিন্ন বিপদ থেকে উদ্ধার করতেন। কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় যে নবরত্ন ছিল গোপাল ভাঁড় তাদের মধ্যে অন্যতম সদস্য ছিলেন।
‘বীরবল’ মুঘল সম্রাট আকবরের যে ‘নবরত্ন’ সভাসদ ছিল তার মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম রত্ন। ‘বীরবল’ সম্রাট আকবরের দেওয়া একটি উপাধি এবং তার আসল নাম ‘মহেশ দাস’। তিনিও প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা এবং রসবোধের জন্য সুপরিচিত ও বিখ্যাত ছিলেন। তিনি ১৫২৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৫৬০ সালে আকবরের রাজসভায় কবি ও গায়ক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর তিনি ধীরে ধীরে সম্রাট আকবরের একজন ঘনিষ্ঠ ও বন্ধু হয়ে ওঠেন।
আলাওল ‘রোসাঙ্গ’ রাজসভায় কবি ছিলেন এবং সেখানেই তিনি তার কাব্যগুলো রচনা করেন। বাংলা সাহিত্যে আরাকানকে ‘রোসাং বা রোসাঙ্গ’ নামে অভিহিত করা হতো। আলাওলের পূর্ণ নাম ছিল সৈয়দ আলাওল (১৬০৭-১৬৮০)। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের কবিদের মধ্যে বিশেষ করে মুসলিম কবিদের মধ্যে তাকে শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলা পাশাপাশি তিনি আরবি, ফারসি, হিন্দি, সংস্কৃতসহ বহু ভাষার পণ্ডিত ছিলেন। ‘পদ্মাবতী’ তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। এছাড়াও ‘সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামাল’ এবং ‘সপ্তপয়কর’সহ বহু গ্রন্থ রচনা করেন।
‘চাণক্য’ মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা এবং এই সাম্রাজ্যের উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি কৌটিল্য নামেও পরিচিত ছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং তার পুত্র বিন্দুসারের রাজ উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সামরিকনীতি, কূটনীতি সব দিক থেকেই তিনি মহাজ্ঞানী ও পণ্ডিত ছিলেন। প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস, দর্শন, অর্থশাস্ত্র, রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেন যা পরবর্তীতে সবার মৌলিক পাঠ্য হয়ে ওঠে। এছাড়াও তিনি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন।
গোপাল ভাঁড়, বীরবল, আলাওল এবং চাণক্যের প্রসঙ্গটি এখানে আলোচনার কারণ হলো তাদের সাথে রাজ্য, রাজা, রাজপরিবার, রাজদরবারের একটি সম্পর্ক ছিল, যা আমার নিবন্ধের আলোচনার মূল বিষয়। এক সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলও রাজ শাসনের অধীনে ছিল
মন্ত্রী, সেনাপতি ছাড়াও আরও কিছু ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত থাকতেন যারা রাজ্যের সবচেয়ে জ্ঞানী, পণ্ডিত, বিদ্বান এবং বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। তাদের কারো পরিচয় ছিল রাজপণ্ডিত, কারো ধর্মীয় রাজগুরু, রাজকবি, রাজবৈদ্য, রাজগায়ক। তারা প্রত্যেকে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, নৃত্য-কলা, সামরিকবিদ্যা, অর্থনীতি, কূটনীতি, রাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি থেকে শুরু করে সব কিছুতেই শ্রেষ্ঠ ছিলেন। তারা সকলেই শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং সম্মানের পাত্র ছিলেন। বিপদে আপদে তারা রাজাকে নানা পরামর্শ দিয়ে রাজ্য পরিচালনায় সহযোগিতা করতেন। তারা রাজসভা ও রাজদরবারের গৌরব ও অলংকার ছিলেন। আজ আমার নিবন্ধটি সেরকম চারজন রাজপণ্ডিতকে নিয়ে, যারা আবার প্রত্যেকেই তঞ্চঙ্গ্যা জাতিগোষ্ঠী থেকে ছিলেন। তারা বিভিন্ন সময়ে চাকমা রাজদরবার ও রাজপরিবারকে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন।
রাজগুরু শ্রীমৎ প্রিয়রত্ন মহাস্থবিরঃ শ্রীমৎ প্রিয়রত্ন মহাস্থবিরের গৃহ নাম পালকধন তঞ্চঙ্গ্যা। তিনি চাকমা ধর্মীয় রাজগুরু ছিলেন। চাকমা রাজা ভুবন মোহন রায় যখন খাগড়াছড়ি দীঘিনালায় দশবল রাজ বিহার নির্মাণ করেন, তখন তিনি এই রাজবিহারের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে চাকমা রাজগুরু পদে অভিষিক্ত হয়ে একই বিহারে ১৯২০-১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অবস্থান করেন। তিনি রাজগুরু হওয়ার পাশাপাশি একজন দক্ষ সংগঠক এবং সমাজ সংস্কারক ছিলেন। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে চাকমা রাজ পূর্ণ্যাহ্ন দিনে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিক্ষু সমিতি’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বিমলানন্দ মহাস্থবির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তৎকালীন সময়ে যে কয়েকজন বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং মহাপুরুষ আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠীকে আলোর পথ দেখিয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম পথপ্রদর্শক ছিলেন এই রাজগুরু।
রাজগুরু শ্রীমৎ অগ্রবংশ মহাস্থবিরঃ শ্রীমৎ অগ্রবংশ মহাস্থবিরের গৃহ নাম ফুলনাথ তঞ্চঙ্গ্যা। তিনি তার সমসাময়িকদের মধ্যে জ্ঞান, গরিমা, বিনয় এবং পাণ্ডিত্যে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত ছিলেন। তাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অভিভাবক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়, পুরো বাংলাদেশ ও বিশ্ব বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্ধকারে আলোর দিশারী ছিলেন। এই মহাপণ্ডিতের জন্ম ২৩ নভেম্বর ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার কুতুবদিয়া গ্রামে। ১৯৪৮ সালে ত্রিপিটক শাস্ত্রে এম.এ এবং ১৯৫৪ সালে পালি শাস্ত্রে ডাবল এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৪-১৯৫৬ সালে মায়ানমারে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ বৌদ্ধ মহাসংঘীতে তিনি একজন বিশ্ব বৌদ্ধ পণ্ডিত হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। এই কৃতিত্ব শুধু তঞ্চঙ্গ্যা জাতিগোষ্ঠীর জন্য নয়, সমগ্র দেশের জন্য গৌরবের। পরবর্তীতে তিনি ‘অগ্রমহাপণ্ডিত’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৫৮ সালে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের আমন্ত্রণে দেশে ফিরে তাকে রাজগুরু পদে অভিষিক্ত করা হয়। তিনি ২০০৩ সালে মহাসংঘনায়ক উপাধি লাভ করেন এবং ২০০৪ সালে মায়ানমার সরকার তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করে। তিনি পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ (ঢাকা)-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন এবং শিশুকরুণা সংঘ (কলকাতা)-এরও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এই মহান ব্যক্তি ২০০৮ সালের ৫ জানুয়ারি পরলোকগমন করেন।
রাজকবি পমলাধন তঞ্চঙ্গ্যাঃ পমলাধন তঞ্চঙ্গ্যা চাকমা রাজ পরিবারের রাজকবি ছিলেন। তিনি ‘ধর্ম্মধ্বজ জাতক’ (১৯৩১) নামে একটি ধর্মীয় পুস্তক লেখেন, যেটি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রথম রচিত এবং প্রকাশিত কোন গ্রন্থ। এই ‘ধর্ম্মধ্বজ জাতক’ গ্রন্থকে অনেকে চাকমা রাজবাড়ি থেকে প্রকাশিত ‘গৌরিকা’ (১৯৩৬) পথপ্রদর্শক হিসেবে মত দেন। তবে পমলাধন তঞ্চঙ্গ্যা গৌরিকার সমসাময়িক লেখক হয়েও কেন তাঁর লেখা গৌরিকায় প্রকাশিত হয়নি বিষয়টি নিয়ে সুধী মহল বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং রহস্যজনক বলে মত প্রদান করেন। তবে অনেকের মত গৌরিকা হয়তো তাঁর মেধা এবং পান্ডিত্যকে ধারণ করতে পারেনি। আর অনেকের মত তিনি সম্ভবতঃ কট্টর জাতিগত বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। যেটি আমরা পরবর্তীতে পাহাড়ী বাংলার কবি কবিরত্ন শ্রী কার্ত্তিক চন্দধ তঞ্চঙ্গ্যার সাথেও ঘটেছে। সম্ভবতঃ এই কারণে নন্দলাল শর্মা ‘কবি কার্ত্তিক চন্দধ তঞ্চঙ্গ্যা একজন উপেক্ষিত কবি’ (সূত্র: রাঙ্গামাটি, ̄স্বাধীনতা সংখ্যা, ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা, ৩১ শে মার্চ ১৯৮৫ ইং, পৃষ্ঠা:৪) বলে মত দেন। ‘ধর্ম্মধ্বজ জাতক’ এর পাশাপাশি ১৯৪৩ সনে তিনি ‘সত্য নারায়ণের পাঁচালী’ এবং ‘কর্মফল’ লেখেন। তিনি মিশ্রিত তঞ্চঙ্গ্যা এবং চাকমা ভাষায় রুত্তি সুন্দরী বারমাস, আলস্যা মেলার কবিতা, বিয়াল্লিশ ভাতরাদ নামে তিনটি বারমাস লেখেন। বর্তমানে পুস্তক আকারে ‘চান্দোবী বারমাস’টি যে বাজারে রয়েছে এর মূল পান্ডুলিপি তাঁর বাবা লিখেছেন বলে মত দেন পমলাধন তঞ্চঙ্গ্যার বড় ছেলে তরুন চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা।
প্রথম দিকে তিনি হাতে লিখে বই ছাপাতেন। পরবর্তীতে নিজের আবিস্কৃত এবং তৈরি করা হস্তাচালিত প্রেসের মাধ ̈মে তিনি তাঁর ছাপার কাজটি সম্পূর্ণ করতেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথম প্রেস (হস্তাচালিত প্রেস) প্রচলন করেন এই পমলাধন তঞ্চঙ্গ্যা। মূলতঃ তাঁর হাত ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রেসের জগতে প্রবেশ করে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের আধুনিক প্রেসের যে প্রচলন শুরু হয় সেতু হিসেবে কাজ করেছেন পমলাধন তঞ্চঙ্গ্যা এবং তাঁর হস্তাচালিত প্রেস। তাছাড়া তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথম কাঠের তৈরী হরফ বা অক্ষর প্রচলন করেন। রান্না ঘরে চুলার উপর জমে থাকা আন্নোয়া (কালো বস্ত), পাতার রস এবং কেরোসিন ব্যবহার করে তিনি লেখার কালি তৈরি করেন।
গিঙ্গিলি শ্রেষ্ঠ রাজগিঙ্গিলি জয়চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যাঃ রাজ গিঙ্গিলি জয়চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা। তিনি কানা গিঙ্গিলি হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। চাকমা রাজা নলিনাক্ষ রায় তাঁকে রাজগিঙ্গিলি উপাধি দিয়ে বরণ এবং স্বীকার করে নেন। তাছাড়া তিনি রাজা ভুবন মোহন রায় এবং রাজা ত্রিদিব রায়সহ এই তিন রাজার অতি ঘনিষ্ঠ, সন্মানিত এবং পূজনীয় ছিলেন। রাজ পরিবারের সাথে তাঁর সর্ম্পক অতি পুরানো এবং সুহার্দ্যের । রাজগিঙ্গিলি জয়চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যার বাড়ি রাঙ্গামাটি ১০৮ মানিকছড়ি মৌজা গ্রামে। কৈশোর বয়স থেকেই তিনি চিরদিনের জন্য দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলেন। জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য তিনি হাতে বেহেলা এবং কন্ঠে গিঙ্গিলি গানের সুর তুলে নেন। তাঁর সময়ে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ গিঙ্গিলি এবং গিঙ্গিলিদের রাজা ছিলেন। সে সময় চাকমা জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ গিঙ্গিলি ছিলেন শ্রীকান্দ্র গিঙ্গিলি । চাকমা সমাজে তাঁর আবেদন গগনচুম্বী, তিনি পর্যন্ত রাজার সামনে গিঙ্গিলি জয়চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করেন, মেনে নেন ও তাঁকে গিঙ্গিলিদের রাজা এবং ওস্তাদ বলে সম্বোধন করেন। তাঁর (জয়চন্দধ) সাথে কোন গিঙ্গিলি ভুলেও প্রতিযোগিতা বা চ্যেলেঞ্জ করার সাহস করতো না এবং দেখাতো না। কোন প্রতিয়োগিতায় জয়চন্দ্র অংশগ্রহণ করছেন শুনলে বাকি প্রতিযোগীরা তাঁদের নাম প্রত্যাহার করে নিতেন। সকলেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকার করে নিতো। সকলে একবাক্যে স্বীকার করতো জয়চন্দ্র গিঙ্গিলির কন্ঠের মধ্যে স্বয়ং সরস্বতী বসবাস করেন। তাঁর সাথে প্রতিযোগিতা করতে যাওয়া মানে স্বয়ং সরস্বতীর সাথে প্রতিযোগিতায় যাওয়া এবং তাঁর (সরস্বতি) সাথে দৃষ্টতা দেখানো। কানা গিঙ্গিলি বেঁচে নেই ঠিকই কিন্তু তাঁর নাম, গান, সৃষ্টি এবং আবেদন রাজবাড়ি, রাজদরবারের গন্ডি পেড়িয়ে পাহাড়ের আনাচে-কানাচে এখনও ধ্বনিত হচ্ছে, উচ্চারিত হচ্ছে।
উপসংহার: তঞ্চঙ্গ্যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হয়েও জ্ঞান, মেধা, শিক্ষা এবং পান্ডিত্য দিয়ে তাঁরা চাকমা জাতির সবচেয়ে উর্বর অংশ তথা রাজপরিবারের মর্যাদা এবং সন্মানের অংশ ছিলেন। চাকমা রাজরিবার তাঁদেরকে রাজ্যের সর্ব্বোচ্চ সন্মানে অধিষ্ঠিত করেছেন। এই রাজর্ষিক সন্মান তঞ্চঙ্গ্যা জাতিকে মর্যাদাবান * পরিচিতি: সম্পাদক, প্রকাশক, গীতিকার এবং উর্ধ্বতন ব্যাংক কর্মক




